• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

ফিসারির দখলে বিলীন সড়ক : চরম দুর্ভোগে কয়েক হাজার গ্রামবাসী


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ১২:৩১ AM / ৭৮
ফিসারির দখলে বিলীন সড়ক : চরম দুর্ভোগে কয়েক হাজার গ্রামবাসী

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা : ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সদর ইউনিয়নের কোনাবাড়ী গ্রামে প্রায় দেড় কিলোমিটার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক ফিসারির দখলে কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই দখলদারিত্বে সড়কটি এখন অকেজো হয়ে পড়েছে, অথচ সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় এই সড়ক দিয়ে ছোট যানবাহনসহ প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করতেন। কিন্তু প্রভাবশালীদের লাগামহীন ফিসারি বিস্তারের কারণে ধীরে ধীরে রাস্তার অস্তিত্বই মুছে যেতে বসেছে। এখন সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়ে মাত্র কয়েক ফুটে নেমে এসেছে—যা দিয়ে হেঁটে চলাও দুঃসাধ্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ১২ হাত প্রশস্ত সড়কের স্থানে বর্তমানে নামমাত্র একটি সরু পথ অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিও ফিসারির পাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পথের ওপর লাগানো হয়েছে কলাগাছ, তৈরি হয়েছে ঝোপঝাড়—যেন ইচ্ছাকৃতভাবে জনসাধারণের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সামান্য অসতর্কতায় যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

এই সড়কটি কোনাবাড়ী নদীর পাড় সড়ক থেকে গ্রামের ভেতরে প্রবেশের একমাত্র সংযোগ পথ। আশপাশে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস, রয়েছে একটি আলিম মাদ্রাসা, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ঈদগাহ মাঠ। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি এখন কার্যত অচল।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৩ সালে এলজিইডির অর্থায়নে প্রায় বিশ ফুট প্রশস্ত একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সেতুও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। সেতুর মুখেই গড়ে তোলা হয়েছে দুটি ফিসারি, যার ফলে সরকারি স্থাপনাটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে—যা স্পষ্টভাবে সরকারি সম্পদের অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত।

ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তা আছিল, এখন নাই। ফিশারি কইরা সব দখল কইরা ফেলছে। আমরা যাইমু কই? সরকারি পুল থাকলেও ব্যবহার করতে পারি না। এইটা আর রাস্তা না, কষ্টের আরেক নাম।”

স্থানীয় কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, “আমাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে। রাস্তা না থাকায় অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থায় আমরা দিশেহারা।”

কোনাবাড়ী ইসলামিয়া মহিলা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইকবাল হোসাইন বলেন, “শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী কমে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ দিয়ে আসতে অনেকে ভয় পায়। বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।”

কোনাবাড়ী চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক একে এম সাইদুল ইসলাম বলেন, “ছোট ছোট শিশুদের জন্য এই পথ অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করতে হয়।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহবুবুল আলম পল্টন বলেন, “১৮ ফুট সরকারি হালটের এই সড়কটি দখল হয়ে গেছে। ফিসারির মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসেনি।”

স্থানীয় এস এম শাহীন ইসলাম সরকার দখলের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রাস্তার ধারে আমাদেরও একটি ফিসারি রয়েছে। তবে আমরা ইতোমধ্যে রাস্তা সংস্কারের জন্য ফিসারির পানি নিষ্কাশনে সেলো মেশিন বসিয়েছি। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে আমার বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফন করতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। আমরা চাই, দখলমুক্ত করে রাস্তাটি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক এবং এলাকাবাসীর ভোগান্তি কমুকa।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে ফিসারির কারণে কোনো রাস্তা দখল হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করা হবে।’”

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এতদিন ধরে প্রকাশ্যে একটি সরকারি সড়ক দখল হয়ে থাকলেও প্রশাসনের নজরে আসেনি কীভাবে? স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এই দখলদারিত্ব দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

দ্রুত সড়কটি দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।