• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ন

সাবমেরিন ও বাংলাদেশের সামরিক শক্তির সম্ভাবনা


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৪, ২০১৭, ৮:১৬ PM / ১১৮
সাবমেরিন ও বাংলাদেশের সামরিক শক্তির সম্ভাবনা

 
জুবায়ের আল মাহমুদ : একজন বিখ্যাত জেনারেল George S. Patton বলেছিলেন – “শত্রুকে দুর্বল মনে করা বোকামি, কিন্তু তাদের বেশি শক্তিশালী ভাবাও অনুচিত”।আমরা জাতিগতভাবে একটু ঘরকুনো স্বভাবের । আমাদের দেশের লোকজনের ধারনা আমরা সামরিক শক্তিতে নেহায়েত দুর্বল । কেউ আক্রমন করলে আমাদের পিছনের দরজা দিয়ে পালানো ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকবে না । তাই সামরিক ব্যয়কে নিছক বিলাসিতা বা অপব্যয় মনে করেন অনেকেই । সম্প্রতি বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’ নামে দুটি সাবমেরিন। টর্পেডো ও মাইন বহনকারী এই সাবমেরিন শত্রুজাহাজ এবং সাবমেরিনকেও আক্রমন করতে পারবে । ২০ কোটি ৩০ লাখ ডলার (১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ) ব্যয়ে কেনা সাবমেরিন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্জন । কারণ এমন ঘটনা বাংলাদেশে আগে কখনও ঘটেনি। বাংলাদেশের অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু সাবমেরিন মানে ডুবোজাহাজ ছিল না। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে এর আগে মাত্র ৪০টি দেশের সাবমেরিন ছিল।এখন ৪১ তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সাবমেরিন শক্তিধর দেশের তালিকায় উঠে এল।সমরাস্ত্রের ধরন দুটি আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক। টর্পেডো ও মাইনসমৃদ্ধ সাবমেরিন দুটি আক্রমণাত্মক। বর্তমানে যা বাস্তবতা, তাতে বাংলাদেশকে হয়তো আর কখনোই কোন যুদ্ধ করতে হবে না। কিন্তু আক্রমণ করার বা আক্রান্ত হলে প্রতিরোধের সক্ষমতা থাকতে হবে । জাতিগত ভাবে আমরা আগ্রাসী না এবং ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যায় যে আমরা কখনওই কাউকে আগে থেকেই আক্রমণ করিনি ।তাই বলে আক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়াটাও বোকামি । স্বাধীনতার ৪৬ বছরে বাংলাদেশ সামরিক শক্তিতে একটু একটু করেই এগুচ্ছে । ভূ-অবস্থানগত কারনে বাংলাদেশ এমন একটা স্থানে যার গুরুত্ব অপরিসীম, সেটা যেমন প্রতিবেশীর কাছে তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক মহলেও। বাংলাদেশের ৩ দিকে ভারত ও একদিকে মায়ানমার এবং বঙ্গোপসাগর । সেই হিসেবে বলা যায় দেশের ৮৫% সীমান্ত ভারতের সাথে, ১০% মায়ানমারের সাথে এবং ৫% সমূদ্রে রয়েছে। আর সামরিক শক্তির দিক দিয়েও এই দুই দেশ আমাদের থেকে এগিয়ে।‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার (জিএফপি)’ নামের একটি ওয়েবসাইট মার্কিন গোয়েন্দা দফতর সিআইএ’র প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্বের সামরিক শক্তিধর ১২৬ টি দেশের তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় ৫৩ নম্বর অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ সামরিক শক্তিধর দেশ বাংলাদেশ। এছাড়া এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৩৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। বাংলাদশের প্রতিবেশি তিন রাষ্ট্র ভারত , পাকিস্তান ও মিয়ানমারের অবস্থান যথাক্রমে ৪, ১৭ ও ৪৪তম । তালিকায় এক নম্বরে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সবার শেষে অর্থাৎ ১২৬ তম অবস্থানে আছে সোমালিয়া।যুক্তরাষ্ট্রের পরই আছে রাশিয়া এবং এরপর চীন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাখাতে সহযোগিতায় সামরিক শক্তিধর দেশগুলোর আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে । বাংলাদেশকে সমরাস্ত্র সরবরাহ, সন্ত্রাস প্রতিরোধে সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ইত্যাদি খাতে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত । ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পারিকর ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বার্তা দিয়ে যান।স্বাধীনতার পর ৪৫ বছরের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম কোন ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রস্তাব দেয় ভারত।ভারত দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি করতে চায়। ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী সেনাবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা, বাংলাদেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি এবং সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া জঙ্গিবাদ মোকাবেলাসহ অন্যান্য হুমকি মোকাবেলায়ও সম্মিলিতভাবে অভিযান চালানোর বিষয়টি রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ভিয়েতনাম ও মরিশাসের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় করার জন্য ৫০ কোটি ডলার লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ সহায়তা দেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সবসময় আগ্রহ প্রকাশ করেছে । ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন।গত বছরের মাঝামাঝিতে ঢাকা সফর করেন চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চ্যাং ওয়ানকুয়ান।গত আট বছরের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম কোন চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঢাকা সফর। এছাড়াও চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান জেনারেল সু কি লিয়াং বাংলাদেশ সফর করেছেন । চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে মধ্যে চারটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে । বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা চীন থেকে বরাবরই উচ্চতর পেশাদারিত্বের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে এবং বাংলাদেশ চীন থেকে থেকে সামরিক সরঞ্জজাম কিনে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ চীন থেকে বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ চীন থেকে পাঁচটি মেরিটাইম পেট্রোল ভেসেল, দুটি করভেট, ৪৪টি ট্যাঙ্ক, ১৬টি জেট ফাইটার, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে।সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ নামে পাঁচ বছর মেয়াদি চার ধাপের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর প্রথম ধাপ ২০১১ থেকে ২০১৫ শেষ হয়েছে । দ্বিতীয় ধাপ ২০১৬ থেকে ২০২০ চলছে । তৃতীয় ধাপ ২০২১ থেকে ২০২৫ এবং চতুর্থ ধাপ ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালে বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমান সরকারের আমলে যেসব সামরিক কেনাকাটা হচ্ছে, তা দ্বিতীয় ধাপের অংশ । সরকার গত পাঁচ বছরে সামরিক খাতে কেনাকাটার জন্য বেশ কয়েকটি চুক্তি করেছে । এ পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) জন্য ১৫ হাজার ১০৪ কোটি টাকার অস্ত্র, গোলাবারুদসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে । বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে সক্রিয় কর্মী সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার। আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে সুনাম কুড়িয়েছে এবং অনেকেই বিদেশ থেকে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত । বাংলাদেশ গত এক দশকে বদলে গেছে অনেকটাই । আগের সেই বিদেশ নির্ভরতা কমেছে বহুলাংশে । সামাজিক সব সূচকে দারুণ উন্নতি হয়েছে ।অর্থনীতির সূচকগুলোও হয়েছে ঊর্ধ্বগামী ।তাই সামরিক সক্ষমতাও থাকা দরকার। সামরিক সক্ষমতা বাংলাদেশকে বহিঃবিশ্বের কাছে আত্নবিশ্বাসী করে তোলবে বহুলাংশে। অগ্রগতির এ বাংলাদেশ তার সব সক্ষমতার পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতায়ও এগিবে যাবে বহুদূর। একদিন হয়ত প্রথম বিশ্বের কোন দেশের তালিকায় সযত্নে উঠে আসবে বাংলাদেশের নাম এবং সেই সাথে হবে মজবুত সমরাস্ত্র কাঠামোবিশিষ্ট বিশ্ব মানচিত্রে দাপুটে এক দেশ।
লেখক : জুবায়ের আল মাহমুদ
কবি, শিক্ষার্থী – এমবিএ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/৮:১৫পিএম/৪/৪/২০১৭ইং)