• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

শ্রীলঙ্কাকে বিদায় জানিয়ে ফাইনালে টাইগাররা


প্রকাশের সময় : মার্চ ১৬, ২০১৮, ১১:৩১ PM / ১২৫
শ্রীলঙ্কাকে বিদায় জানিয়ে ফাইনালে টাইগাররা

ঢাকারনিউজ২৪.কম, ঢাকা : লর্ডসের ব্যালকনিতে উদোম শরীরে জার্সি উড়িয়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। এবার কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে জয়ের উত্তেজনায় খালি গায়ে ছুটলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। গোটা বাংলাদেশ নাগিন নাচ শুরু করল। ততক্ষণে ম্যাচ শেষের আগের বলে ছক্কা মেরে মাহমুদউল্লাহ বেঙালুরুর ঋণ শোধ করেছেন। প্রায় হারতে বসা ম্যাচটি জিতিয়ে বাংলাদেশকে তুলে দিয়েছেন নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে। তাও যাদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের টুর্নামেন্ট সেই শ্রীলঙ্কা বিদায় করে দিয়ে। তার আগে একটি বলকে কেন্দ্র করে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ছিল তুমুল উত্তেজনা। সাকিব তো তার দলকে মাঠ থেকে চলে আসতেই বললেন। চলে আসলে কি আর টি-টুয়েন্টির ইতিহাসে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সেরা এই জয়ের দেখা মিলত! টাইগারদের জয় ২ উইকেটের। ১ বল হাতে রেখে।

নিয়মিত অধিনায়ক সাকিবের ফেরার ম্যাচে টস জিতে শুক্রবার কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কাকে ৭ উইকেটে ১৫৯ রানে বাধে বাংলাদেশ। এরপর জেতা ম্যাচটা হারার কাছে চলে যায় নাটকীয়ভাবে। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ ১৮ বলে চার ও ২ ছক্কায় ঐতিহাসিক এক জয় এনে দিয়েছেন ৪৩ রানে অপরাজিত থেকে। মিলিয়েছেন শেষ ৬ বলে ১২ রানের সমীকরণ। শেষ ওভারটিতে আছে একটি চারও। ১৯.৫ ওভারে বাংলাদেশের ৮ উইকেটে ১৬০। ১৮ তারিখের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে লড়বে টাইগাররাই যেমন লড়েছিল গত বছর এশিয়া কাপের ফাইনালে, ঢাকায়।

ম্যাচশেষে বুনো উল্লাসে মাতেন টাইগাররা। গর্জাতে থাকা প্রেমাদাসা তখন ম্যাচসেরা খেলোয়াড় মাহমুদউল্লাহর কাণ্ডে নিস্তব্ধ। ওখানেই লঙ্কান কয়েক খেলোয়াড়ের সাথে কয়েক বাংলাদেশির আবার উত্তেজনা। যেটা শুরু হয়েছিল শেষ ওভারের শুরুতে। মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রথম বলে বাউন্সার দিয়েছেন উদানা। পরের বলটি তারও সামান্য ওপরে। লেগ আম্পায়ার নো এর সিগনাল দেন। অন্য আম্পায়ার দেন না। তখন রান নিতে গিয়ে রান আউট মোস্তাফিজ। সেই সিদ্ধান্ত দেন আম্পায়ার। বাংলাদেশি ফিল্ডাররা মাঠে ঢোকেন। মাহমুদউল্লাহ আম্পায়ারের সাথে কথা বলেন। ওদিকে আগুন হয়ে সাকিব সাইড লাইনে এসে মাহমুদউল্লাহদের মাঠ ছাড়তে নির্দেশ দেন। চতুর্থ আম্পায়ার এসে বোঝান। খালেদ মাহমুদ সুজনও অগ্নিশর্মা। মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে ওপরে ড্রেসিং রুমে যান সাকিব। পেছনে একটু ঠাণ্ডা হয়ে স্ট্যান্স নেন মাহমুদউল্লাহ। ৪ বলে দরকার ১২। প্রথমটি বাউন্ডারি মারেন মাহমুদউল্লাহ। পরেরটিতে দারুণ ২। এবং পঞ্চম বলে ছক্কা মেরে দেশকে এনে দেন অসাধারণ জয়। বেঙালুরুতে ২০১৬ সালে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে শেষটায় মাহমুদউল্লাহও ছিলেন ভারতের বিপক্ষে জেতা ম্যাচ হারানোর জন্য কাঠগড়ায়। মুশফিকুর রহীম শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই আগের ম্যাচে ঋণ শুধেছেন। এবার শুধলেন আগের তিন ম্যাচে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক।

শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি টাইগারদের। দলীয় ১১ রানেই ওপেনার লিটন কুমার দাস ফেরেন খালি হাতে। আকিলা ধনাঞ্জয়ার অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে রাখা বলে মারতে গিয়ে মিড অনে লঙ্কান অধিনায়ক থসারা পেরেরার হাতে সহজ ক্যাচ তুলে দেন তিনি। এরপর তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামেন সাব্বির রহমান। পর পর দুই বলে চার মেরে শুরু করলেন। কিন্তু ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। ব্যক্তিগত ১৩ রানে বিদায় নিয়েছেন ধনাঞ্জয়ার দ্বিতীয় শিকার হয়ে। স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে পরেন এ ড্যাশিং ব্যাটসম্যান।

এরপর আগের দুই ম্যাচের হাফসেঞ্চুরিয়ান মুশফিকুর রহীমকে নিয়ে দলের হাল ধরেন তামিম ইকবাল। গড়েন ৬৩ রানের দারুণ এক জুটি। দলীয় ৯৭ রানে মুশফিকের বিদায়ে ভাঙ্গে এ জুটি। ২৫ বলে ২৮ রান করে আমিলা আপনসোর বলে লঙ্কান অধিনায়ক থিসারা পেরেরার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন সাজঘরে। এরপর বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি তামিমও। হাফসেঞ্চুরি তুলেই গুনাথিলাকার বলে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে পড়েছেন তিনি। ৪২ বলে ৪টি চার ও ২টি ছক্কায় ৫০ রান করেন তিনি। এরপর স্কোর বোর্ডে ৩ রান যোগ করতেই আউট হন সৌম্য সরকার। ফলে বড় চাপে পড়ে যায় টাইগাররা।

এরপর অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে নিয়ে দলের হাল ধরেন মাহমুদউল্লাহ।  সাকিব-মাহমুদউল্লাহ যখন ব্যাট করছিলেন তখন মনে হয়েছিল বাংলাদেশের জয় কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু শেষ তিন ওভারে দরকার ছিল ২৯ রান। হাতে ছিল ৫ উইকেট। কিন্তু তকিন্তু ২৮ রানের জুটি গড়ার পর আউট হয়ে যান সাকিব। ফ্লিক করতে গিয়ে ধরা পরেন ফাইন লেগে। এরপর ই ছন্দপতন। ১১ রানের ব্যবধানে আবার নেই ৩ উইকেট। শঙ্কায় পড়ে যায় টাইগাররা। তবে সব শঙ্কা শেষ করে টাইগারদের জয়ের উল্লাসে মাতান মাহমুদউল্লাহ। ১৮ বলে ৪৩ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন। ৩টি চারের সাওঙ্গে ২টি ছক্কায় নিজের ইনিংস সাজান তিনি।

কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে শুক্রবার টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে শ্রীলঙ্কা। শুরুতেই টাইগারদের বোলারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে দারুণ চাপে পরে দলটি। ৪৮ দিন পর মাঠে ফিরে ইনিংসের শুরু করেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তবে উইকেট পান নিজের দ্বিতীয় ওভারে। দানুশকা গুনাথিলাকাকে লং অনে সাব্বিরের রহমানের তালুবন্দি করেন সাকিব। পরের ওভারে আঘাত হানেন মোস্তাফিজ। ভয়ংকর ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিসকে ফেরান কাটার মাস্টার। মিড উইকেটে সহজ ক্যাচ ধরতে কোন ভুল করেন সৌম্য সরকার।

এক ওভার পর আবার বোলিং করতে এসে লঙ্কান শিবিরে জোড়া আঘাত হানেন মোস্তাফিজ। প্রথমটি রানঅউটের সুবাদে। মিরাজের কাছ থেকে বল পেয়ে ঝাপিয়ে পরে উইকেট ভেঙে আউট করেন উপুল থারাঙ্গাকে। এর এক বল পরে শিকার করে দাসুন সানাকাকে। মোস্তাফিজের অফকাটার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহীমের হাতে। এরপর দলীয় ৪১ রানে লঙ্কান শিবিরে আবার আঘাত হানেন টাইগাররা। এবার মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে ক্যাচ ধরেছেন সেই মোস্তাফিজ। মিরাজের বলে সুইপ করতে চেয়েছিলেন জিবন মেন্ডিস। তবে ঠিকভাবে করতে না পারায় বল চলে শর্ট ফাইন লেগে দাঁড়ানো মোস্তাফিজের হাতে।

৪১ রানে প্রথম সারীর পাঁচ উইকেট তুলে নিয়েও চাপে রাখতে পারেনি টাইগাররা। অধিনায়ক থিসারা পেরেরাকে নিয়ে দারুণ এক জুটি গড়েন কুশল পেরেরা। তাদের ৯৭ রানের জুটিতে ভর করেই ১৫৯ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় স্বাগতিকরা। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কুশল পেরেরা এদিনও তুলে নেন হাফসেঞ্চুরি। টুর্নামেন্টের চার ম্যাচে এটা তার তৃতীয় ফিফটি। লঙ্কানদের ইনিংস মেরামত করে ৬১ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। ৪০ বল মোকাবেলা করে ৭টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে নিজের ইনিংস সাজান এ ব্যাটসম্যান। থিসারা পেরেরাও তুলে নেন হাফসেঞ্চুরি। খেলেন ৫৮ রানের ইনিংস। ৩৭ বলে সমান ৩টি করে চার ও ছক্কার সাহায্যে এ রান করেন তিনি।

প্রথম দুই ওভারে দারুণ বোলিং করলেও শেষ দুই ওভারে ভীষণ খরুচে ছিলেন মোস্তাফিজ। শেষ দুই ওভারে ৩৫ রান দিয়েছেন তিনি। শেষপর্যন্ত ৩৯ রানের খরচায় ২টি উইকেট পান কাটার মাস্টার। ১টি করে উইকেট পেয়েছেন রুবেল, সৌম্য, সাকিব ও মিরাজ। তবে এদিন দলে বিশেষজ্ঞ বোলার হিসেবে দলে থাকলেও নাজমুল ইসলাম অপুকে কোনো ওভার করাননি সাকিব।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

শ্রীলঙ্কা: ১৫৯/৭ (২০ ওভার) (গুনাথিলাকা ৪, মেন্ডিস ১১, কুসল ৬১*, থারাঙ্গা ৫, শানাকা ০, জিবন ৩, থিসারা ৫৮, উদানা ৭*, দনাঞ্জয়া ১*; সাকিব ১/৯, রুবেল ১/৪১, মোস্তাফিজ ২/৩৯, মিরাজ ১/১৬, মাহমুদউল্লাহ ০/২৯, সৌম্য ১/২১)।

বাংলাদেশ: ১৬০/৮ (১৯.৫ ওভার) (তামিম ৫০, লিটন ০, সাব্বির ১৩, মুশফিক ২৮, সৌম্য ১০, মাহমুদুল্লাহ ৪৩*, সাকিব ৭, মিরাজ ০, মোস্তাফিজ ০, রুবেল ০*; ফার্নান্দো ০/১০, ধনাঞ্জয়া ২/৩৭, আপোন্সো ১/১৯, পেরেরা ০/২০, গুনাথিলাকা ১/২৪, মেন্ডিস ১/২৪, উদানা ১/২৬)।

ফল: বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ : মাহমুদউল্লাহ।

(ঢাকারনিউজ২৪.কম/কেএস/১১:৩০পিএম/১৬/৩/২০১৮ইং)