

ফারুক ওয়াহিদ : গ্রিক পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে ফিনিক্স একটি দীর্ঘায়ু পাখি যার চক্রাকারভাবে নবজন্ম হয়, ভস্ম থেকেই জন্ম নেয় নতুন জীবন, প্রাণ পায় নতুন জীবনের, শুরু হয় আবারও অবিনাশী যাত্রা- ঠিক সেরকমই মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের ৪৬ বছর পর ২০১৮তে এসে মুক্তিযোদ্ধারা মারাত্মক সাংবিধানিক পরিচয় সংকটে পড়ে এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে কোনঠাসা হয়ে পড়া ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’রা শাশ্বত যাত্রা শুরু করেছে।
রূপকথার প্রবাদ পুরুষ বাঙালির অবিসংবাদিত সংগ্রামী নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বাঙালি জাতির পিতা ‘বঙ্গবন্ধু দি গ্রেট’ শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’-দের একমাত্র অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে আবার একত্রে মিলিত হয়েছে ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’রা হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের রুদ্রধ্বনি, প্রাণের ধ্বনি, মুক্তির ধ্বনি, যুদ্ধ জয়ের ধ্বনি, সুদীপ্ত সাহসের ধ্বনি শিহরণ জাগা ‘জয়বাংলা’ স্লোগান নিয়ে।
একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি/সুরক্ষা প্রদান’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা তালিকা/গেজেট থেকে ভুয়াদের বিতাড়ন’- এই দুই দফা প্রাণের দাবিতে ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’র সংগঠনের আহ্বায়ক লেখক, গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবীর আহাদ ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ বর্ণাঢ্য সংবাদ সম্মেলনে সারা বাংলাদেশ থেকে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধা মো: আবুল বাসার-কে সদস্য-সচিব করে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি তৈরি করে ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’ নামক সংগঠন-এর আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে নাতিদীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’র আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবীর আহাদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কোনও অবস্থায় দেড় লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি।” তিনি আরো বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত জাতীয় সংবিধানের মূল উৎস-চেতনা প্রস্তাবনার কোথাও ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা’- এই শব্দদ্বয় নেই।” বীর মুক্তিযোদ্ধা আবীর আহাদ আরো বলেন, “স্বাধীনতার ৪৫(পয়তাল্লিশ) বছরের মধ্যে বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে বহুবার রেডিও টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পরও কোনো মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।” মুক্তিযোদ্ধা আবীর আহাদ-এর সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের প্রেস বিজ্ঞপ্তির পূর্ণ বিবরণ:
প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা,
আপনাদের সবাইকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার রক্তিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজ একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও জাতীয় সংবিধানে সেই অবদানের কোনোই স্বীকৃতি নেই, অপরদিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে আমাদের মানমর্যাদা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। আমরা আশা করি আমাদের আজকের বক্তব্যগুলো আপনারা বিবেকের সারথি হিসেবে আপনাদের প্রচারমাধ্যম দ্বারা সরকারের কাছে তুলে ধরবেন।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা জানেন, ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুমহান নেতৃত্বে ও দিকনির্দেশনায়, মুজিবনগর আওয়ামীলীগ সরকারের পরিচালনায় দেশবাসীর সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতায় আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের যাবতীয় শৌর্য-বীর্য-ত্যাগ ও বীরত্ব দিয়ে হানাদার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতার বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় এই যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রচিত মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত জাতীয় সংবিধানের মূল উৎস-চেতনা প্রস্তাবনার কোথাও ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা’- এই শব্দদ্বয় নেই। যে কোনো দেশের জাতীয় সংবিধানের মূল চেতনাই হলো সংবিধানের ‘প্রস্তাবনা’। আমাদের জাতীয় সংবিধানেও প্রস্তাবনা রয়েছে। আপনাদের সদয় জ্ঞাতার্থে জনাচ্ছি যে, সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খৃীস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।” এখন আমাদের বক্তব্য হলো, আমরা মুক্তিসংগ্রাম করেছি তা ঐতিহাসিক সত্য, তবে আমাদের সেই মুক্তিসংগ্রামের শেষ পরিণতি ছিলো অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ- সেটা আরো ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি প্রস্তাবনায় নেই! আমরা অহরহ মুক্তিযুদ্ধ নামটিসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি, অথচ ‘মুক্তিযুদ্ধের’ স্বীকৃতি সংবিধানের প্রস্তাবনায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আপনারা এও জানেন, মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুদ্ধ জড়িত। আর যুদ্ধের সাথে ‘যোদ্ধা’ জড়িত। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সাথে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেই মুক্তিযুদ্ধের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের উল্লেখও সংবিধানে কোথাও খুঁজে পাইনি! সংবিধানের প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে “… … … যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল” বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও অবদানের কোন উল্লেখ নেই! জনগণ ও শহীদদের কথা আছে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কথা নেই। প্রস্তাবনায় যেখানে মুক্তিসংগ্রাম, জনগণ ও শহীদের কথা আছে, তাহলে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এসব বৈশিষ্ট্যের উৎস কোথায়? মহাকালের ইতিহাসে, সংবিধানের প্রস্তাবনার আলোকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দদ্বয় কি বিলীন হয়ে যাবে না? এখন প্রশ্ন থেকে যায়, সংবিধানে যেখানে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নেই, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রভৃতি কী উৎস-চেতনা থেকে এসেছে? সাংবিধানিক স্বীকৃতি ব্যতীত এসবগুলো কি ভবিষ্যতে অবৈধ বলে গণ্য হবে না? কালচক্রে এসব বিষয়গুলো কি বিস্মৃতির অতলগহ্বরে হারিয়ে যাবে না? এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে আমাদের জাতীয় সংবিধানের যথাস্থানে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দদ্বয় সন্নিবেশিত করে এর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা,
এবার আসি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গে। এ বিষয়ে যাওয়ার পূর্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের(জামুকা) ২০১৭ সালের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সম্পূর্ণ বাতিলসহ মুক্তিযোদ্ধা লাল মুক্তিবার্তা, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের গেজেট ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তালিকার সকল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অপসারণ দাবি করছি এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি উচ্চপর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধুপ্রদত্ত সংজ্ঞার ভিত্তিতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটা নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছি।
আমরা জানি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কোনো অবস্থায়ই দেড় লাখের বেশি হবে না। এ প্রসঙ্গে কারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন সে-বিষয়ে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত সংজ্ঞা উল্লেখ করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল: “মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যেকোনো সংগঠিত দলের (ফোর্স) সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।”
বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত সংজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নানান গোঁজামিলের সংজ্ঞা দিয়ে হাজার হাজার অ-মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি রাজাকারদেরও মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ফেলেছে। ইতোমধ্যে ভারতীয় তালিকা ব্যতীত লাল মুক্তিবার্তা, গেজেট ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তালিকায় প্রায় ৫০/৬০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে বলে আমরা জানি- যা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম এবং বর্তমান মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক জাতীয় সংসদে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তথা মন্ত্রণালয়ের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ পনের হাজারের উর্ধ্বে। এর মধ্যে ৬০(ষাট) হাজারই ভুয়া। এই ভুয়াদের বিতাড়িতকরণ ও যদি কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে থাকেন, তাদের অর্ন্তভুক্ত করার দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের প্রথমদিকে বর্তমান মন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বে জামুকা একটি নির্দেশিকা তৈরি করে ভারতীয় তালিকা ও লাল মুক্তিবার্তা তালিকাকে (যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই) বাদ রেখে, গেজেট ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সনদধারীসহ অনলাইনে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে সারা দেশের উপজেলা/থানাওয়ারী ‘মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি’ গঠন করে ভুয়া বাতিল ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা অর্ন্তভুক্ত করার কার্যক্রম গ্রহণ করে। জামুকার নির্দেশিকায় ভারতীয় ও লাল মুক্তিবার্তার মুক্তিযোদ্ধা- এমন ৩ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যেকোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবেন, এমনতর একটি আত্মঘাতি ফরমূলা নির্দেশিকায় জুড়ে দেয়ার ফলে যাচাই-বাছাই কমিটির অধিকাংশ সভাপতি/সদস্যরা ও সুযোগসন্ধানীরা তা গ্রহণ করে পুরো যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে একটি বাণিজ্যিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে। এই অপরিণামদর্শী দুর্বল ফরমুলার বদৌলতে সারাদেশে লক্ষ লক্ষ অ-মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি হাজার হাজার রাজাকারদের নিকট থেকে ২-১০(দুই-দশ)লক্ষ টাকার বিনিময়ে তাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দেয়ার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে এবং এসব বাণিজ্যের ভাগ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জামুকা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডারসহ ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও পাতি নেতারা পেয়েছেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে যাচাই-বাছাই কমিটি নতুন প্রায় পৌনে দু’লক্ষকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করে জামুকাতে সুপারিশ করেছে যার ৯৯% ভাগই ভুয়া। এ ব্যতীত লাল মুক্তিবার্তার ভুয়াসহ বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে গেজেটভুক্ত প্রায় ৫০/৬০ হাজার ভুয়াদের বিতাড়নের পরিবর্তে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে যাচাই-বাছাই কমিটি তাদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশ করেছে!
প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা,
স্বাধীনতার ৪৫(পয়তাল্লিশ) বছরের মধ্যে বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে বহুবার রেডিও টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পরও কোনো মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারপরও কেউ যদি বাদ পড়ে থাকেন তাহলে অন্য প্রক্রিয়ায় তাদের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ রাখা যেতো। কিন্তু ৪৬ (ছেচল্লিশ) বছর পর এমন কী হলো যে, ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘কারা কারা মুক্তিযোদ্ধা হতে চান’ জাতীয় আত্মঘাতি ঘোষণা দেয়া হলো? আসলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জামুকা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দুর্নীতিবাজ চক্র একটি বাণিজ্যিক মনোবৃত্তি নিয়ে এমন একটি পদ্ধতি বের করে ঐসব অপকর্ম করেছে। মূলত: ১০(দশ) হাজার টাকার সম্মানী ভাতা, তাদের সন্তানদের চাকরির কোটা ও অন্যান্য কিছু সুযোগ হাতিয়ে নেয়ার কুমতলবে লক্ষ লক্ষ অ-মুক্তিযোদ্ধা বাঙাল ও রাজাকাররা এ সুযোগে জাতে ওঠার জন্য অর্থকড়ি নিয়ে নেমে পড়েছে। জাতির পিতার কন্যা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে যেটুকু বদান্যতা দেখিয়েছেন, সেটিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, জামুকা ও তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যাসহ তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছেন। রাষ্ট্রীয় তালিকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সহ-অবস্থান হতে পারে না। অথচ এ-চক্রটি স্বার্থান্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে! এ-প্রক্রিয়ায় তারা মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র নামের অমর্যাদাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বেদিমূলে আঘাত হেনেছেন। অপরদিকে সব মিলিয়ে ২(দুই) লক্ষাধিক ভুয়াদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দেয়ার নামে সরকারের তথা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের হোলিখেলা শুরু করেছে। এমতাবস্থায় উপরোক্ত অযোগ্যতা-অদক্ষতা এবং অন্যায়-অপরাধ করার কারণে আমরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও জামুকার সদস্যদের তাদের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান এবং অ-মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর কারিগর তথাকথিত যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি/সদস্যসহ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচার করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আমরা আমাদের বক্তব্য দীর্ঘায়িত করে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না। মূলত: আমাদের দাবী দু’টি। (১) বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং (২) ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিতাড়ন। আমাদের এ দু’টি দাবিকে আপনাদের প্রচার মাধ্যম দ্বারা সরকারের কাছে তুলে ধরা এবং আমাদের এ যৌক্তিক দাবির প্রতি আপনাদের সমর্থনও আমরা প্রত্যাশা করছি। আমাদের এ দাবির প্রতি সমর্থনদানের জন্য সর্বস্তরের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ও যুবসমাজের প্রতিও আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আমাদের দাবি মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু-কন্যার সরকারের প্রতি আস্থাশীল। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগের গর্ভ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার জন্ম। সেই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র নামের ওপর কালিমা লেপনকারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় দেয়ার মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি করবেন বলে আমাদের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই চান না যে, বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দাবিতে রাজপথে নামুক। তাই আমরা একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে অনতিবিলম্বে আমাদের দাবি দু’টি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি এবং আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে “একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা” সংগঠনের শুভ আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করছি।
পরিশেষে, সাংবাদিক বন্ধুগণের প্রতি আমাদের বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি এবং আমি একটি কবিতার কলি দিয়ে এখানেই আমাদের বক্তব্য শেষ করছি-
“সাংবিধানিক স্বীকৃতি আর ভুয়া-খেদা সংগ্রামে-
মুক্তিযোদ্ধা জেগে ওঠো, জেলা থানা গাঁওগেরামে!
‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’
এই নামে।”
জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
আবীর আহাদ; আহ্বায়ক, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা]
‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’ সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়- তাছাড়া ফেসবুকের লাইভ-এ সম্প্রচার করার ফলে সারা বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধারাও সরাসরি এই সংবাদ সম্মেলন প্রত্যক্ষ করেছেন।
‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’র আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবির আহাদ-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
বিশিষ্ট লেখক-গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবীর আহাদ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের চাকুলিয়ায় সি-ইন-সি স্পেশাল স্ট্যাব্লিশমেন্ট থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে নবম সেক্টরাধীন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে সি-ইন-সি স্পেশাল গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে প্রেরিত হন। কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া হানাদার পাকিস্তানি সাব-ক্যান্টনমেন্টকে ঘিরে তিনি গেরিলা ও সম্মুখ সমরসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন রণাঙ্গনে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী আবির আহাদ ‘দৈনিক বাংলা’সহ বহু পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও লেখালেখি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য থাকায় ১৯৭৫ সালে বাকশাল কী ও কেন? এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন যা পরবর্তীকালে ‘বঙ্গবন্ধু: দ্বিতীয় বিপ্লবের রাজনৈতিক দর্শন’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। আবীর আহাদ বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থের প্রণেতা। এখনো মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লেখালেখি ও গবেষণা কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ২০০১ ও ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এছাড়া তিনি বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত। নব গঠিত ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’র প্রাণের দাবি দু’টি তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
বাংলা একাডেমির ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ পবিত্র সংবিধানে উল্লেখিত এই ‘মুক্তি সংগ্রাম’ শব্দটার অর্থ আছে এভাবে- ‘মুক্তিসংগ্রাম’- “স্বাধীনতা ও সামাজিক মুক্তির জন্য যে আন্দোলন” -এখানে একবারও যুদ্ধে বা সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বা গেরিলা যুদ্ধের কথা বলা হয় নাই। অর্থাৎ ‘মুক্তিসংগ্রাম’ হলো মুক্তির জন্য আন্দোলন কিন্তু সেটা যুদ্ধ নয় বা সশস্ত্র যুদ্ধ নয়। আবার বাংলা একাডেমির একই অভিধান অর্থাৎ ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’-এ ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের অর্থ আছে এভাবে- ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’- “দেশের মুক্তির জন্য যাঁরা যুদ্ধ করেন; দেশকে হানাদার মুক্ত করার জন্য যাঁরা যুদ্ধে রত হন; বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য যাঁরা ১৯৭১-এ লড়াই করেছিলেন।” এখানে স্পষ্ট করে ‘যুদ্ধ’ এবং ‘লড়াই’ কথাগুলো উল্লেখ আছে। এমনকি বাংলা একাডেমি ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’-দের সম্মান করতে একটুও ভুলেননি- এখানে ‘যাঁরা’-তে চন্দ্রবিন্দু দিতেও ভুল করেননি- এমন কি ‘করেছিলেন’ এই ভাষা ব্যবহার করে এভাবেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করেছেন- একেই বলে ‘বাংলা একাডেমি’।
তাহলে পবিত্র সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে যদি কোনা ‘সশস্ত্র যুদ্ধ’ না হয়ে থাকে তাহলে আমরা ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’রা কারা? কী আমাদের পরিচয়? মুক্তিবাহিনী ভারতে সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে হানাদার পাকিস্তানিদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে এবং শেষের দিকে মিত্রবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে সম্মুখ রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে আত্মসমর্পণ করিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’-দের সশস্ত্র ট্রেনিং এর দলিলপত্র, এফ.এফ(ফ্রিডম ফাইটার) নং এমনকি মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং ক্যাম্পে তোলা ছবিসহ ভারতে সযত্নে সংরক্ষিত আছে- এমনকি বাংলাদেশ সরকারের কাছেও সেই ঐতিহাসিক দলিলপত্রের কপি পাঠানো হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক পরিচয় সংকটের প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারবেন না বা ইচ্ছে করেই দিবেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক পরিচয় সংকটের প্রশ্নে বাংলাদেশে একমাত্র একজন শুধু একজনই এই প্রশ্নের উত্তর ও সমাধান দিতে পারবেন তিনি হলেন ‘মুক্তিবাহিনী, মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা’-দের একমাত্র অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পার হয়ে একাত্তরে মৃত্যুঞ্জয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনন্তকাল ধরে প্রবাহিত হবে। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ অনিঃশেষ ও অন্তহীন- তাই মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরজাগরূক থাকে। এই চেতনাকে ধারণ করতে পারলেই আমরা জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ হতে পারব এবং বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলে হারানো বাংলাকে আবার ফিরে পাব।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১১:৩৫পিএম/৩১/১/২০১৮ইং)
আপনার মতামত লিখুন :