• ঢাকা
  • বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

দূরদেশে কেন নারীকর্মীদের দুর্দশা?


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯, ৩:৩২ PM / ১০৯
দূরদেশে কেন নারীকর্মীদের দুর্দশা?

সৌদি থেকে সবুজ আহমেদ : সৌদি আরব হচ্ছে শ্রমের খোঁজে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় গন্তব্য।পুরুষ কিন্বা নারী বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ শ্রমিক হিসাবে কর্মরত আছে সৌদিতে।সরকারি হিসাবে ২০লাখ বেসরকারী তথ্য মতে ৩৫ লাখেরও বেশি শ্রম অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। বিভিন্ন তথ্য ও পত্রিকা সূত্রে জানা যায় সারা বিশ্বে ১কোটি ৪৬লাখ ৭৮৯জন বাংলাদেশি অবস্থায় করছে প্রবাসে।তন্মধ্যে বড় একটা অংশ ৭লাখ ২৭৮জন নারী।একক দেশ হিসাবে শুধু সৌদিতে আছে প্রায় ৩লাখেরও বেশি নারীগৃহকর্মী।

এ সব নারী অভিবাসী মূলত ঘরের কাজে আসে বেশি,কিছুসংখ্যক হাসপাতালের নার্সিংহোমে কাজ করে থাকে আর বাকিরা পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কোম্পানিতে কর্মরত।নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়া পুরুষ শ্রমিকের চাইতে আর্থিক ভাবে সহজ হলেও বিদেশের মাটিতে তাদের দুঃখ দুর্দশা পুরুষ কর্মী অপেক্ষা অনেক বেশি।

পরিবার ও সমাজ যেমন বিদেশগমন ভালোভাবে গ্রহণ করেনা।বিদেশে এসেও তাদের সে দুঃখ গুঁচেনা।

নারীদের মালিক পক্ষের ঘরের ভিসা দিয়ে এনে বেচে দেয়া হয় তৃতীয়পক্ষ বা অন্য গৃহস্থের গৃহে।শেষে কাজ যানেনা বা করেনা বলে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।পরিবারের গৃহকর্ত্রী কর্তৃক মারধর,গৃহকর্তার যৌন হয়রানি মালিকপক্ষের নিকটাত্মীয় পর পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি,খেতে না দেয়া,দেশে কথা বলতে বারন করা,চুক্তির বাহিরে বেশি কাজ করানো,বেতন দেওয়ার বেলায় গড়িমসি উল্লিখিত সমস্যাগুলো নারী শ্রমিকরা বিদেশে ভুক্তভোগী।

অভাব অনটন তাড়াতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে নারীরা প্রবাস জীবন বেচে নেয়।কিন্তু যে স্বপ্নের আশায় পরবাসে পাড়ি জমায় তা অনেকাংশে বুমেরাং হয়। বিদেশে কাজ করতে এসে তারা বুঝে শ্রমিকের চোখে তাদের দেখা হয়না তারা টাকায় কিনে আনা ক্রীতদাসী।আর ক্রীতদাসীদের সাথে সব কিছুই করে অধিকাংশ আরবেরা।তাইতো বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বেশির ভাগই যৌন হেনস্তার শিকার। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি।নারী শ্রমিকদের বৈদ্যুতিক শক, সিগারেটের আগুনের ছ্যাঁকাসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে থাকতে হয়।

এরপর জীবনের ঝুঁকির সাথে একদেশ হতে অন্য দেশে পাচার হওয়ার রিস্কও তাড়া করে তাদের। লিবিয়া থেকে লেবানন বা সুদান পাচার করে দেয়া হচ্ছে এমন খবরও ফলাও করে প্রচার হয় সংবাদপত্রে। বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাঁচতে হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেয়া, চুক্তির বাহিরে বেশি কর্মঘন্টা কাজ করানো, হ্যান্ড ফোন ব্যবহারের বাধা,পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকার চিত্র প্রতিনিয়ত মূল সংবাদ মাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে।বিদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা শক্তিশালী নয় বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারী প্রবাসী শ্রমিকের গুরুত্ব অনেক।অভিবাসী নারী শ্রমিক মাত্র ৩০ হাজার হতে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বিদেশ যেতে পারে। বিদেশে দেখভাল, সুরক্ষা দেয়া সরকারের দায়িত্ব।লক্ষ্য রাখতে হবে দেশীয় দালাল মুনাফালোভী এজেন্সি যেন অধিক বেতনের প্রলোভন না দেখায়।আরবদেশের ভাষা, পরিবার, পরিবেশে সম্পর্কে দেশে থাকতেই সম্যক ধারণা দেয়া।পরবর্তী সময়ে কম বেতন দেয়া, ঠিকমতো বেতন না দেয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না দেয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ না দেয়া, ইকামা বা ওয়ার্ক পারমিট আটকে রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা এবং শর্ত ভঙ্গের দায়ে নারী শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে চাইলে স্বজনদের কাছে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালদের বেআইনি অর্থ দাবিসহ নারী শ্রমিকদের সব সমস্যা অধিকতর গুরুত্বদিয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত সমাধানের পথ বের করা।
যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের পূর্ণ আইনি সহায়তা প্রদান, দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো এবং দূতাবাসে লেবার উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে নারী শ্রমিকদের সমস্যার কথা শোনা, কেননা নির্যাতিত নিপীড়িত নারী,পুরুষ লেবার কাউন্সিলের কাছে লাজ লজ্জায় ভয়ে খোলাখুলি ভাবে সঠিক সেক্সুয়াল হ্যারেজমেনেটর কথা বলতেও পারেন না।অনেক নারী যৌন হয়রানি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিকার পেতে লজ্জাবোধ সংকোচ, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।

বিদেশের মাটিতে ৭লাখ নারী কর্মী কাজ করলেও তাদের সমস্যা এবং সহযোগিতার জন্য (সৌদি আরব দুটি সেফ হোম রিয়াদ, জেদ্দা ছাড়া ) অন্য কোন দেশে নেই সেফ হোম বা শেল্টার হোম, দ্রুত সহযোগিতা পাওয়ার জন্য নেই হটলাইন কানেকশন।

বিদেশে নারী কর্মীর চাহিদা দিনকে দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রবাসে নারী কর্মীর সমস্যা।

প্রবাসে নারী কর্মীর সবচেয় বড় সমস্যা ভাষাগত! মালিক আর শ্রমিক কেউ বুঝে না কারো ভাষা।মালিক সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা রপ্ত করে ঐ দেশে নারী শ্রমিক পাঠালে মালিক-কর্মী ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।

অভিবাসী এক্সপার্টদের মতে সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে বিদেশে আমাদের নারী কর্মীদের নির্যাতনের হার কমে আসবে।প্রথমতো জনশক্তি পাঠানোর আগে সইশুদ্ধ চুক্তিটা মূখ্য।ভাল করে খেয়াল রাখতে হবে চুক্তিনামায় যেন ফাঁকফোকর না থাকে।দ্বায়িতশীল বিভাগ বিশেষ করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রনালয় সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিয়ম নীতিগুলো কঠোরভাবে দেখভাল করতে পারে। ভাষা সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখানো।এছাড়া ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান। চুক্তিতে অনুযায়ী উল্লিখিত কাজের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মী পাঠানো।ভাষা জ্ঞানহীন অদক্ষ কর্মী যাতে বিদেশ যেতে না পারে কঠোরভাবে নজর রাখা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দূতাবাসে অভিজ্ঞ নারী লেবার কাউন্সিল নিয়োগ করা গেলে সর্বোপরি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে পারলেই সুফল পাওয়া যাবে।

(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৩:৩২পিএম/২৬/১২/২০১৯ইং)