

সাব্বির আহমেদ : সারি সারি পাহাড়। যেদিকে দুচোখ যায় যেন পাহাড় আর পাহাড়। যেখানে আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে। মেঘ ছুঁয়েছে পাহাড়,আর ঝরণা ছুঁয়েছে নদীকে। এ যেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। বলছিলাম মেঘের রাজ্য সাজেকের কথা। প্রকৃতি সব মানুষকেই কম বেশি কাছে টানে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভেসে বেড়াতে চান না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই মুশকিল। প্রকৃতির সেই টানে আমরাও মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলাম মেঘের রাজ্য সাজেকে।
এপ্রিল মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা হলো আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ট্যুর এবং এক্সকারশনের সময়। বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সকল শিক্ষার্থীই ছিল অনেক উৎসুক। এতেদিন যেসব জায়গার নাম শুনে এসেছে এখন সেসব জায়গা নিজ চোখে দেখবে। ট্যুরের তারিখ নির্ধারণের পরে থেকেই যেন সকলের রাতের ঘুম একরকম হারিয়ে গেছে। সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো কবে ৬ এপ্রিল আসবে। অবশেষে কাঙ্খিত দিনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হতে যাত্রা শুরু হলো। আর আমাদের ট্যুরের সঙ্গী হলেন বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড.মোঃ আনোয়ারুল হক এবং সহকারী শিক্ষক নাজমুল হুদা। বিকালে ঢাকার মাশরুম সেন্টারে পৌঁছালো আমাদের বাস। বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী দিন পরিদর্শন করা হলো ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ বায়োটেকনোলজি এবং মাশরুম সেন্টার। বিকালের দিকে রওনা হলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। রাতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যখন গাড়ি যাচ্ছিল তখন সবাই একরকম ভয়ই পেয়েছিল। ভয়ঙ্কর সেই রাস্তা পেরিয়ে ভোরবেলায় আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছালাম। এরপরে সকালের নাস্তা শেষ করে চাঁদের গাড়িতে করে আলুটিলা গুহা। চাঁদের গাড়ি এতোদিন বাংলা সিনেমাতে দেখলও বাস্তবে সেই গাড়িতে উঠতে পেরে সকলেই অনেক উল্লসিত ছিল। আলুটিলা গুহা থেকে ঝুলন্ত সেতু দেখে গাড়ি রওনা দিল মেঘের রাজ্য সাজেকের উদ্দেশ্যে।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেক ভ্যালির দূরুত্ব ৭০ কিলোমিটার। দীঘিনালা থেকে ৪৯ কিলোমিটার এবং বাঘাইহাট থেকে ৩৪ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা আর্মি ক্যাম্প হয়ে সাজেকের দিকে যাত্রা করে চাঁদের গাড়ি। পাহাড়ের ঢেউয়ের মতো আঁকা-বাঁকা বন্ধুর পথে যখন আমরা সাজেকের উদ্দেশ্যে তখন সকলেই আনন্দে উৎফুল্ল। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে উঠার সময়ে দুপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সকলের হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছিল। সাজেকে পৌঁছানোর পরে সকলের মনে একটাই প্রশ্ন এটা কি বাংলাদেশে নাকি অন্য কোথাও। বাংলাদেশের মধ্যেও যে এতো সুন্দর জায়গা আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। বিকালের দিকে সকলে মিলে হেলিপ্যাডের উপরে থেকে সূর্যাস্ত পর্যবেক্ষণ করেছিলাম মেঘের উপর সাওয়ার হয়ে। রাতে যখন আমরা হাঁটছিলাম তখন মনে হচ্ছিল পাশ দিয়ে মেঘের নদী বয়ে যাচ্ছে ।সাজেকের আরেকটা মনোমুগ্ধকর বিষয় হলো খাবার। ব্যাম্বু চিকেন, ব্যাম্বু চা সহ আরো কয়েকটি বিশেষ খাবার সকল ভোজনরসিককেই মুগ্ধ করবে অনায়াসেই। সকালে উঠে সকলে মিলে হাঁটা শুরু করলাম সাজেকের সবথেকে উঁচু স্থান কংলাক পাড়াতে।
সকাল ১০ টায় চাঁদের গাড়িতে করে ফিরে আসলাম খাগড়াছড়ি। তারপরে বাসে করে রাঙামাটি। সকাল বেলায় ট্রলারে করে পেদা টিং টিং, আদিবাসী পাড়া, সুবলং ঝরনা, শুভলং বাজার সহ আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে বিকালে আমরা রওনা দিলাম বাংলাদেশের সবথেকে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। কক্সবাজারে পৌঁছানোর পরে সকালে সূর্যোদয় উপভোগ করে সকলে বিশ্রাম নিলাম। এরপরে সকলে মিলে একসাথে সুগন্ধা বিচের সমুদ্রের পানিতে নেমে পড়লাম। সমুদ্রের পানিতে যেন সত্যিই একরকম যাদু আছে। নিমিষেই সকলের মাঝে নেমে আসলো আনন্দের জোয়ার। বিকালে সবাই মিলে যাওয়া হলো মাছেদের রাজ্য রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়াল্ডে। এ যেনো মাছেদের স্বর্গরাজ্য। মাথার উপরে রঙবেরঙের মাছ খেলা করে বেড়াচ্ছে। রাতে সকলে সমুদ্রের পাড়ে বসে খোশগল্পে মেতে উঠে। আর সমুদ্রের মধুর শব্দ সকলের মনে এনে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া। পরেরদিন সকালে স্পিড বোটে করে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ। বিকালে ইনানী বিচ,হিমছড়ি ঘুরে সকলে বাসে উঠে পড়লাম। তারপরে বাস চলতে শুরু করলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে।
ভ্রমণ হয়তো শেষ হয়েছে বেশকিছুদিন আগে, কিন্তু তার রেশ এখনো রয়ে গেছে সকলের মনে। এ রেশ কখনো কাটবেও না, সকলের মনে স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে আজীবন।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৯:০৭পিএম/৬/৫/২০১৯ইং)
আপনার মতামত লিখুন :