সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি : মা এবং বাবা এই দুটি সম্পর্কের চেয়ে আপন নাকি কিছু নেই। বিশ্বাসও করতাম তাই। কিন্তু বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা বলে অন্য কথা। জন্ম দিলেই “প্রতিটা” বাবা মা ই তার সন্তানের কাছে পূজনীয় হবার যোগ্যতা রাখেনা। যদি তাই হতো, তাহলে আপন কণ্যা সন্তানকে ধর্ষণের দায় বাবার কাঁধে পড়ত না। যদি তাই হতো, কোনো আয়োজন না হোক্, কিন্তু সংসারের একমাত্র কামাইসুদ ছেলে তার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবে বলে ছেলের গায়ে নিয়মের হলুদ হাতে মেহেদী না লাগিয়ে ঘরে বৌ তুলত না কোনো মা। যদি তাই হতো, মেয়ের সবচেয়ে বিপদের দিনে মা বাবা নিজের স্বার্থের জন্য একসময়ের কামাইসুদ মেয়ের সংসার ভাঙার জন্য নানা ছল-চাতুরি করে সবকিছু লুটেপুটে মেয়েকে নিঃস্ব করে পথে ছুড়ে ফেলতনা। যদি তাই হতো, ছেলের বিয়ে করে আনা মিষ্টভাষি ও মিশুক প্রকৃতির বৌকে দিনের পর দিন অপমান অপদস্ত আর যৌতুক কিংবা বিভিন্ন বাহানায় তার প্রতি অন্যায়-অবিচার করতনা ছেলের বাবা মায়েরা। যদি তাই হতো, মেয়ের ইনকামে ভাল ভাল খাওয়া-পরার জন্য (বিলাসিতা) ৩০/৩৫ এর কোঠা পার হবার পরেও মেয়েকে বিয়ে না দেয়ার নামে নানা বাহানা খুঁজতনা বাবা মা। অথচ তারা চিন্তাও করেনা যে ৩০/৩৫ এর পরে একটা মেয়ের বিয়ে হলে তা ওই মেয়ের জন্য সুখের নাও হতে পারে। তার সন্তান ধারনে সমস্যা থেকে শুরু করে কত ধরনের সমস্যাই হতে পারে তা ওই বাবা মা চিন্তাও করেনা। তারা শুধু তাদের নিজেদের বেঁচে থাকার চিন্তায় মগ্ন। এদেশে এখন অনেক পরিবারে এমন বাস্তবতা। জন্ম দিলেই সব বাবা মা পূজনীয় হয়না। আমরা বৃদ্ধ বয়সে মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বাধ্য করলে কিংবা তাদের উপর অন্যায় অবিচার করলে যেমন আমরা ভাল সন্তানের খাতায় নিজেদের নাম দেখতে পাইনা, তেমনি মা বাবা হয়ে সন্তানের প্রতি অন্যায় করলে তারাও আর পূজনীয় বাবা মায়ের পর্যায়ে পড়েন না। এখন সময় শুধু ‘‘যত পাই তত চাই’’। যার ফলে দিনকে দিন বাবা মায়ের মতো সবচেয়ে ত্যাগ ও শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোর মাঝেও স্বার্থের ছড়াছড়ি। যত দিন যাচ্ছে ততই মানুষের লোভ বাড়ছে। আরো একটু ভাল থাকার আরো একটু ভাল খাওয়ার আরো একটু ভাল পরার লোভ। এই লোভের কারণে সন্তানদের কাছে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত এর সম্পর্ক বাবা মা এখন আর নেয়ামত নয় অনেকের কাছেই। তার উপর প্রায়ই দেখি ঝোপের ঝাড়ে, হাসপাতালের নোংরা ডাস্টবিনে, রাস্তার আস্তাকূড়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ভ্রুণ এবং কখনো কখনো জন্ম নেয়া সদ্যজাত শিশু সন্তানকে নাড়ি সহই(যে নাড়ির টানেই নাকি মা আর সন্তানের সম্পর্ক) ফেলে দিয়ে যাচ্ছে মা এবং কখনো কখনো মা-বাবা দু’জনেই। কারণ, ওদের চারিত্রিক নোংরামির ফসল এই অবুঝ নিস্পাপ সন্তান। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালেই ওদের ফেলে যেতে হবে। হায়রে মা! বাবা মা কিংবা সন্তান বুঝিনা, শুধু বলতে চাই- মানুষ হিসেবে ঘরে-বাইরের প্রতিটি ভাল মানুষদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করা যেমন উচিত, তেমনি মন্দ ও নিজের জন্য ক্ষতিকর সম্পর্কগুলোর বেরাজ্বাল থেকে বেড়িয়ে এসে নিজের ভাল’র জন্য অন্তত একলা থাকাই বাঞ্ছনীয়। কখনো কখনো রক্তের বন্ধনের চেয়ে আত্মার বন্ধন অনেক বেশি খাটি ও স্বচ্ছ হয়, তাইতো দিনকে দিন পরিবারগুলো ভেঙে চুরে একক পরিবারে রুপ নিচ্ছে। আমরা নিজেরা নিজেদের ভুলগুলোকে না শোধরানো পর্যন্ত আবার সেই আগের মতো একান্নবর্তী পরিবার দেখার উপায় নেই। বাবা মা সন্তান কিংবা পরিবারের যে কোনো সদস্যই যার যার দিক থেকে নিজেকে স্বচ্ছ রেখে সম্মিলিতভাবে সম্পর্ক ধরে রাখা যেতে পারে, অন্যথায় …….।
আপনার মতামত লিখুন :