• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন

আত্মবিশ্বাসী মিরাজ


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৯, ২০১৭, ৭:১৮ AM / ১২৭
আত্মবিশ্বাসী মিরাজ

ঢাকারনিউজ২৪.কম:

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১০-১১টি ম্যাচ খেলেছে। মেহেদী হাসান মিরাজকে সে জন্য খুব বেশি দেখাও হয়নি আমাদের। এত তাড়াতাড়ি কোনো খেলোয়াড় সম্পর্কে মন্তব্য করাটাও কঠিন। ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া তো আরও অসম্ভব। তবে যার হবে, সে শুরুতেই তা কোনো না কোনোভাবে বুঝিয়ে দেয়। মিরাজের মধ্যেও সেই লক্ষণ সুস্পষ্ট।
প্রতিভাবান ক্রিকেটার মিরাজ। তা না হলে এত অল্প বয়সে এই পর্যায়ের ক্রিকেটে এসে এত ভালো খেলা সম্ভব ছিল না। তবে স্পিনারদের প্রতি ম্যাচেই পরীক্ষা দিতে হয়। বোলিংয়ে নতুন নতুন বৈচিত্র্যের সন্ধান করতে হয়। একজন স্পিনারকে আমরা তখনই সফল বলব, যখন সে লম্বা সময় ধরে শীর্ষ পর্যায়ে খেলতে পারবে। মিরাজকেও এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এখন যেমন খেলছে, এই পারফরম্যান্স লম্বা সময় ধরে রাখতে পারলেই বোঝা যাবে, তার কাছ থেকে আমরা আসলে কী পেলাম।

মেহেদী হাসান মিরাজ। ছবি: শামসুল হকআন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দলগুলো এখন অনেক ধরনের গবেষণা করে। প্রতিপক্ষের বোলার-ব্যাটসম্যানদের ভিডিও ফুটেজ ধরে ধরে অনেক ধরনের কাজ করে। প্রতিপক্ষের ল্যাপটপকে ফাঁকি দিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা তাই সব ক্রিকেটারকেই করতে হয়। পেস বোলারদের কথাই ধরুন না। এক স্লোয়ারই তো আছে কত রকম!
স্পিনারদের বোলিংয়ে বৈচিত্র্য আনার কাজটা আরও বেশি করতে হয়। নতুন কিছু যোগ করা বা চমকে দেওয়ার মতো কিছু করা। সে জন্য আমাদের স্পিনারদের আরও ভালো সাহায্যও দরকার। বড় বড় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করতে দিতে হবে ওদের। মিরাজের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তাহলেই সর্বোচ্চটা পাওয়া যাবে। বোলিংয়ে খুব বেশি বৈচিত্র্য আনা এত কম বয়সে তাদের নিজেদের পক্ষে সম্ভব নয়। কোর্টনি ওয়ালশের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আরও কিছু সফল ব্যক্তিত্ব দলে থাকলে কাজটা সহজ হতো।
যতটুকু জানি, মিরাজ খুব আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ। আমার দৃষ্টিতে এটাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখনকার দিনে উইকেট, ক্রিকেটের নিয়মকানুন সবই মোটামুটি ব্যাটসম্যানদের পক্ষে। আত্মবিশ্বাস ছাড়া বোলারদের টিকে থাকা কঠিন।
ভালো লাগে দেখে যে, মিরাজের মধ্যে সেটা প্রচুর পরিমাণেই আছে। ক্যারিয়ার লম্বা করতে এই আত্মবিশ্বাসই তাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। ভারত সফরে দেখলাম, ও নিজ থেকেই রবিচন্দ্রন অশ্বিনের সঙ্গে কথা বলতে গেছে। এটা ভালো লক্ষণ। সাহস করে একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়া, পরামর্শ নেওয়া—এসব জিনিস ক্রিকেটারদের মধ্যে থাকতে হয়। আগে মোহাম্মদ রফিক, দুলু ভাইদের মধ্যে এটা দেখেছি। যেচে গিয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতেন তাঁরা। তাতে কিন্তু ওনাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং লাভই হয়েছে। মিরাজও এটা করতে পারছে তার আত্মবিশ্বাস আছে বলেই। এই অভ্যাস ওকে ব্যক্তিগত জীবনেও সাহায্য করবে।
মিরাজের বোলিংয়ে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ওর অ্যাকশন। অর্থডক্স অব স্পিনারের অ্যাকশন যেমন হওয়া উচিত, তা-ই আছে ওর। এ ধরনের অ্যাকশনে চোটে পড়ার আশঙ্কা কম। আর সে যথেষ্ট ফিটও। ক্যারিয়ার লম্বা করতে এসবই একেকটা প্লাস পয়েন্ট। তবে আমার মতো মিরাজেরও সমস্যা একটা আছে। ছেলেটা আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো। এই উচ্চতা নিয়ে টার্ন হয়তো ভালোই পাবে, আরেকটু লম্বা হলে বাউন্সটাও যোগ হতো।
এসবের সঙ্গে আরও কিছু বাড়তি জিনিস দরকার। যেমন প্রচুর খেলা দেখতে হবে ওকে। বিশ্বসেরা অফ স্পিনার যাঁরা আছেন বা ছিলেন—এরাপল্লী প্রসন্ন, জন অ্যাম্বুরি বা মুত্তিয়া মুরালিধরন—তাঁদের খেলা, ভিডিও ফুটেজ প্রচুর দেখতে হবে। এখনকার খেলোয়াড়দের খেলা দেখার অভ্যাস কম। বুঝি ওদের ব্যস্ততা আছে। কিন্তু এখন তো মোবাইল ফোন হাতে নিলেই দুনিয়া মুঠোয় চলে আসে। খেলা দেখার সুযোগ বেড়েছে। অবসরে পুরোনো খেলা দেখে দেখেও মিরাজ অনেক কিছু শিখতে পারবে।
স্পিনারদের জন্য আরেকটা বিষয় খুব জরুরি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করতে হবে। স্পিন বোলিংয়ে অনেক সময় বোলারের অজান্তেই বলটা একটু অন্য রকম হয়ে যায়। ভালো কিছু হলে বা কোনো ডেলিভারি ব্যাটসম্যানকে বিপদে ফেললে, বোলারকে সেটা ধরতে পারতে হবে। একটু পেছনে ফিরে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে কী করাতে বলটা ওরকম হলো। পরে চর্চা করে করে সে জিনিসটাই আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে। এভাবেও কিন্তু একটা বৈচিত্র্য চলে আসে স্পিনারদের বোলিংয়ে। অনুশীলনে লম্বা সময় বল করলে এই জিনিসগুলো হবে।
মিরাজের বাড়তি সুবিধা ওর ব্যাটিং। ব্যাটিংয়ে আরেকটু শক্ত হতে পারলে একজন ভালো অলরাউন্ডার হওয়ার সুযোগ আছে তার সামনে। দলে হয়তো সে বিশেষজ্ঞ অফ স্পিনার হিসেবেই খেলবে, কিন্তু ভালো ব্যাটিং করতে তো বাধা নেই।
আবারও বলি, মেহেদী হাসান মিরাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ আত্মবিশ্বাস, সাহস। আর হাতে তো স্পিন-জাদু আছেই। হয়তো কথাটা বলার এখনো সময় হয়নি, তবু আমি আশাবাদী, এই সাহস আর আত্মবিশ্বাস তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। এত দূরে, যেটা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো দেখছিও না।
অনুলিখিত
লেখক: পরিচালক, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য

 

  (ঢাকারনিউজ২৪.কম/এনএম ৭.১৩এএম/২৯/৪/২০১৭ইং)