

বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধি : নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের গালিমপুর গ্রামের আবুল হোসেন (৫১) একসময় ছিলেন একজন পরিশ্রমী মানুষ। বিভিন্ন স্থানে কায়িক শ্রম ও ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সুখের সংসার। নিজের উপার্জনে তৈরি করেছিলেন একটি বসতভিটাও।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই সুখের সংসারে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন আবুল হোসেন। গত সাত মাস ধরে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিছানাগত। হাত-পা প্যারালাইসিস হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বর্তমানে তিনি অন্ধ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী জীবনযাপন করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। ঘরের গরু-ছাগলসহ যা কিছু ছিল, সবই বিক্রি করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি। বর্তমানে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তো দূরের কথা, পরিবারের মুখে এক মুঠো ভাত জোগাড় করতেও তাদের মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততে হচ্ছে। তাই সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন আবুল হোসেনের স্ত্রী শাহানাজ বেগম (৪৩)।
আবুল হোসেন গালিমপুর গ্রামের মৃত সুকচান আলীর ছেলে। বর্তমানে তার পরিবার চরম মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। নিয়মিত ওষুধ, খাবার এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তার জীবন আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিবারটি এখন অসহায় জীবনযাপন করছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর আগে মাথাঘোরা, বমি, চোখ লাল হওয়া ও চোখের ভেতরে ঘামাছির মতো ছোট ছোট চোটের উপসর্গ নিয়ে আবুল হোসেনের অসুখের শুরু। এরপর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। জেলা সদর হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
পাঁচ বছর ধরে নানা রোগে ভোগার পর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রায় সাত মাস আগে চিকিৎসকের পরামর্শে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি চোখ অপারেশন করে তুলে ফেলতে হয়—এই আশায় যে তিনি সুস্থ হবেন। কিন্তু চোখের সমস্যার পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে তার শরীরে আরও নানা রোগ বাসা বাঁধে। সেগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতেই পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
চোখ অপারেশনের তিন মাস না যেতেই আবুল হোসেনের পুরো শরীর প্যারালাইসিস হয়ে যায়। এখন তিনি সম্পূর্ণ বিছানাগত। মুখে কথাও বলতে পারেন না। মাঝে মাঝে শুধু ‘হুম’ বা ‘আ’ শব্দ করেন। ধারণা করা হয়, তিনি সব কথা শুনতে পান, কিন্তু উত্তর দিতে পারেন না। দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে তার পরিবার আজ কার্যত পথে বসেছে। এই অবস্থায় সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন তার স্ত্রী শাহানাজ বেগম।
আবুল হোসেনের স্ত্রী শাহানাজ বেগম জানান, স্বামীর চিকিৎসার জন্য তার যা কিছু ছিল সবই বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন সংসারের খাবার জোগাড় করতেই দ্বারে দ্বারে হাত পাততে হচ্ছে, সেখানে চিকিৎসা করাবেন কী দিয়ে। তিনি আরও বলেন, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় স্বামীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছেন। সব শেষ করে এখন তিনি একেবারেই নিঃস্ব। স্বামী আবুল হোসেনের চিকিৎসা ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার আহ্বান জানান।
আবুল হোসেনের বোন জমেলা বেগম জানান, আবুল তার ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকেই তিনিই তাকে লালন-পালন করেছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিল আবুল। বর্তমানে এক বছর ধরে তিনি বিছানাগত। চিকিৎসা করা তো দূরের কথা, পরিবারটির মুখে দুই মুঠো ভাত জোগাড় করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের সামান্য সহানুভূতি ও সহায়তাই পারে একটি অসহায় পরিবারের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে।
স্থানীয় শিক্ষক মাহাবুর রহমান বলেন, আবুল তাদের এলাকারই ছোট ভাই। একজন কর্মঠ মানুষকে চোখের সামনে এভাবে শেষ হতে দেখে খুব কষ্ট লাগে। তিনি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি অনুরোধ জানান।
স্থানীয় পাঁকা ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) হেলাল উদ্দিন বলেন, তিনি নিয়মিত আবুল হোসেনের খোঁজখবর নেন এবং নিজের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব আর্থিক সহায়তা করেন। উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে তাকে সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবানদের আবুল হোসেনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
আপনার মতামত লিখুন :