

নয়ন লাল দেব, মৌলভীবাজার : ঐতিহ্যবাহী মনু নদীর তীরঘেষা টিলাগাঁও এর প্রত্যন্ত অঞ্চল লংলা চা-বাগানে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ‘সূর্যতরুণ কোচিং সেন্টার’। দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের লংলা চা-বাগানস্থ বাজার টিলায় অবস্থিত এই কোচিং সেন্টারটি ইতিমধ্যে নজড় কেড়েছে এলাকার জনসাধারনের। লংলা চা-বাগানের সুবিধা বঞ্চিত দরিদ্র ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে স্থানীয় কিছু শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোগে ২০১৭ সালের ৯ই এপ্রিল বাজার টিলার একটি পরিত্যক্ত মাটির ঘরে গঠন করা হয় ‘সূর্যতরুণ কোচিং সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই দুই বছর ধরে স্থানীয় দরিদ্র চা-শ্রমিক সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করে এলাকায় সর্বস্তরে শিক্ষার আলো ছড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন দিবা ও নৈশ এই দুই ধাপে প্রথম শ্রেনী থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় এখানে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাইভেট পড়তে কিংবা শিক্ষার বিভিন্ন উপরকরন কিনতে অক্ষম এই শিক্ষার্থীগন স্কুল শেষ করেই নিজেকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে দল বেধে ছুটে আসেন প্রানের এই কোচিং সেন্টারে। প্রথমে গোটা কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীকে নিয়ে কোচিং সেন্টারটির যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এর ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় দের শতাধিক। মাটির দেয়ালের এই কোচিং সেন্টারটি যেন সুবিধা নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র। কাদা মাটি আর চা-কুড়ি কেন্দ্রিক জীবন সংগ্রামে রত চা-শ্রমিক সন্তানদের স্কুল শিক্ষার পাশাপাশি এই কোচিং সেন্টারে বিনামূল্যে সহায়তা শিক্ষার চাহিদা পূরণ হওয়ায় সন্তানকে নিয়ে আলোর স্বপ্ন দেখছেন অভিবাবকরাও। সম্প্রতি এখানে সাধারণ শিক্ষার সাথে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় নৈতিকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যুক্ত করা হয়েছে শ্রীগীতা শিক্ষাঙ্গন নামক ধর্মীয় বিশেষ ক্লাস এর। সপ্তাহে একদিন নেওয়া হয় এই বিশেষ ক্লাসটি। তবে স্বল্প পরিসরে এই নিঃস্বার্থ প্রতিষ্ঠানটি শুরু হওয়ায় বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীদের তুলনায় স্থান পরিধি অপ্রতুল। এমনকি মাটির দেয়ালের একটিমাত্র ঘরেই বসার তেমন ব্যবস্থা না থাকায় মাটিতেই পাটি বিছিয়ে ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অলাভজনক কোচিং সেন্টারটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চাহিদামত শিক্ষা উপকরণ ক্রয় সহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিক্ষক রাজেশ ভৌমিক বলেন, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা নিতান্তই দরিদ্র, অনেক পরিবার নুন আনতে পান্তা পুরোয় অবস্থা, এদের কাছ থেকে শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে শ্রমের পাশাপাশি অনেক অর্থেরও প্রয়োজন, কিন্তু এখানে কোন আর্থিক সহযোগীতা না থাকায় এটা চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।

এ বিষয়ে টিলাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালিক এর সাথে কথা বললে তিনি উক্ত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এই রকম মহৎ কার্যক্রমে প্রয়োজনে যথাসাধ্য সহযোগীতা করার আশ্বাস প্রদান করেন। লংলা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক এস.কে বড়ুয়া প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে বলেন, আমি অবহিত আছি যে এই চা-বাগানের সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ব্যাপক প্রসারিত করার জন্য কিছু শিক্ষিত তরুনদের উদ্যোগে এই কোচিং সেন্টারটি পরিচালিত হচ্ছে, এটা চা অঞ্চলে শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করবে বলে আশা করি। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন দক্ষিণ কুলাউড়া আঞ্চলিক শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক সংবাদকর্মী জ্ঞান শংকর গৌড় বলেন বর্তমানে সারাদেশে সর্বক্ষেত্রে বিশাল উন্নয়ন সাধিত হলেও দেশের অন্যতম আয়ের উৎস চা-অঞ্চলগুলো অনেকটা সুবিধাবঞ্চিতই রয়ে গেছে, বিশেষ করে বিভিন্ন অসচ্ছলতার কারণে চা-সন্তানরা শিক্ষায় তেমন এগিয়ে যেতে পারছে না, তিনি প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার প্রসারে সূর্যতরুণ কোচিং সেন্টারের মত একটি নিঃস্বার্থ প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহব্বান জানান। সবশেষে বর্তমান সরকারের ডিজিটাল ভিশন বাস্তবায়নে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই, আর এর আলো পৌছে দিতে হবে দেশের সকল প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত, লংলা চা-বাগানের এই প্রতিষ্ঠানটি হতে পারে প্রেরনার উৎস, সৃষ্টি হতে পারে মানবশক্তি, আর বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আলো ছড়ানো উক্ত প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি সহ প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত সহযোগীতার হাত কামনা করেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১১:৩০পিএম/২৮/৩/২০১৯ইং)
আপনার মতামত লিখুন :