

সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি : কয়েকদিন ধরেই শরীরটা ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল যখন তখন। ওষুধের দোকানে প্রেসার মেপে ৮০/৫০ পেয়েছিলাম। আজ ইফতারের আগ মুহুর্ত থেকে আবার খারাপ লাগছিল। ইফতারের পরতো মনে হচ্ছিল- আজই বুঝি শেষ দিন আমার। সাথে সাথে কাউন্সিলর আয়শা আক্তার দিনা আপাকে কল দিলাম। কেননা আমি এই মহামারীর সময়ে কখনও হঠাৎ অসুস্থ হলে প্রথমত দিনা আপা এবং কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ভাই ও কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি ভাইকে সবার আগে খবর দেয়ার বিষয়ে বাড়িতে জীবনসঙ্গীকে বলে রেখেছি। যেহেতু একক পরিবারে শুধুমাত্র আমাদের দু’জন মানুষের বাস, তাছাড়া আমার সাহেব খুব একটা বুঝেওনা এসব, তাই সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষগুলোর নাম ও নাম্বার দিয়ে রেখেছি তার কাছে। কেননা মহামারীর এই দুর্দীনে এই ৩জন মানুষের উপর আমি ব্যক্তিগতভাবেও নির্ভর করি। নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে তাদের ভেতরে যে মানবতার বাস তা ইতিমধ্যেই দেশবাসী তথা বিশ্ববাসী দেখেছে। নিজেদের জীবনকে তোয়াক্কা না করে এই মানুষগুলো সহ আরও বেশ কিছু মানবিক জনপ্রতিনিধি আমাদের গর্ব। এই ৩জনের সাথে আমার সম্পর্কটা একেবারেই পারিবারিক, অন্যদের সাথে কাজের তথা ফর্মালিটির, তাই একান্ত ব্যক্তিগত বিপদের মুহুর্তে তাদেরই আগে খবর পৌছাই। যাই হোক্, খবর পেয়েই দিনা আপা এসে সেই সুফিয়া জেনারেল হসপিটালে নিয়ে গেলো আমাকে, যেখানে এইতো সেদিন এক অসহায় প্রসূতির সাহায্যে নিজে দৌড়ে গিয়ে সেই নারীর অপারেশন থেকে শুরু করে তাকে বাড়ি পৌছে দেয়া সহ সমস্ত প্রকার সহযোগিতা করেছিলেন দিনা আপা, যা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমি বলেছিলাম-আপা নিজে একটা রিক্সা নিয়ে আসি? কিন্তু আপা নিজে এসে আমাকে নিয়ে যাবেন বললেন, কেননা যদি আমি পথেই আরও অসুস্থ হয়ে পরি এই চিন্তায়। সেই সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে চাষাঢ়া এসে পৌছানোর আগ পর্যন্ত বার বার ফোন করে দিনা আপা আমাকে সাহস যুগিয়েছেন। বলেছেন আজ ডাক্তার দেখিয়ে আমাকে নিয়ে শহরময় ঘুরে বেরাবেন। ওনার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতেই আমি ৫০% সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। এরপর সে এসে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দু’জন কথা বলতে বলতে যখন ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ঢুকলাম, তখন প্রেসার মেপে দেখা গেলো ১২০/৮০ অর্থাৎ সাভাবিক। ডাক্তারের চেম্বারে বসে একেবারেই গল্প করার মতো করে ৩জন চা খেলাম। আমার কোনো জ্বর নেই, ঠান্ডা নেই, কাশি তথা করোনা নিয়ে টেনশন করার মতো কিচ্ছু নেই। শুধু শরীরটা মাঝে মাঝে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ডাক্তার এইচ.এম তাইফুুরুল হাসান ভাই বললেন- আল্লাহর রহমতে সব ঠিক আছে, তবে সমস্যা মাত্র দুইটা- ১. শরীরের রক্ত কম থাকায় নার্ভ চলাচলে একটু ধীরগতি হচ্ছে আর ২.অতিরিক্ত টেনশন। পৃথিবীর সমস্ত টেনশন ছাড়তে বললেন। করোনাভাইরাস নামক আতঙ্ক থেকে মনকে বের করে আনতে বললেন। সেই সাথে ঝাল ও চর্বি জাতীয় খাবার এভোয়েড করতে বললেন। এদিকে বার বার চেষ্টা করেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি টাকাও দিনা আপা আমাকে খরচ করতে দিলেন না। সবশেষে বাসায় এসে আবার আমায় দিয়ে গেলেন এবং আগামীকাল হাঁসের ডিম ও খাটি গরুর দুধ পাঠাবেন আমার জন্য। ওইদিকে খবর পেয়েই দেখি কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই বিকাশে কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। জিজ্ঞেস করাতেই বললেন- এটা রাখো। এই সময়ে কারও হাতেই টাকা থাকারও কথা নয়, প্রয়োজন পরতে পারে। সত্যিই হাতের অবস্থা শেষ ৫/৬দিন ধরে একেবারেই খারাপ। কোথাও থেকে কোনো ধরনের বিল এর পেমেন্ট পাচ্ছিনা বার বার নক করেও। অথচ ত্রাণ সহযোগিতার পাশাপাশি লকডাউনের মাঝামাঝি সময়েও কয়েকজনকে সেধে সেধে তাদের পারিবারিক খাদ্য ও মেডিসিন জাতীয় সমস্যার সমাধানে টাকা দিয়ে বলেছি- যখন পারবেন ফেরত দিয়েন, আমার সমস্যা নেই। সেগুলোও চেয়ে পাচ্ছিলাম না। আসলে ২ মাসের ঘরবন্দী ও সবকিছু বন্ধ থাকায় স্টাফদের বেতন, অফিস+বাসাভাড়া, অসুস্থ হলে কিভাবে কি করব, টাকা কোথায় পাব, এটা ওটার চিন্তা সহ নানা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। এটাই হয়ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আমার মনে। যার প্রভাব শরীরেও পরেছে। আরেকদিকে কাউন্সিলর মতি ভাইও ফোন করে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এত এত মানবিক মানুষদের ভালোবাসা আছে যে শহরে, সেই শহরে করোনা নামক আতঙ্ক কাউকে কাবু করতে পারবে না বলে আমার বিশ্বাস। আমার আজকের সবচেয়ে বড় মেডিসিন হচ্ছে- দিনা আপার সাথে ঘুরেছি রিক্সায় করে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত দুইবার। এই সময়টুকুতে সে আমাকে যেভাবে কথা বলে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, ওটাই সবচেয়ে বড় মেডিসিন মনে হয়েছে আমার কাছে। আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভাল আছি। অসুস্থ অবস্থায় আপাকে কল করার পর থেকে এই পর্যন্ত একবারের জন্যও আমি অসুস্থবোধ করিনি। ভেবে নিয়েছি- নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি কাল থেকে আমি আবার ত্রাণ সহায়তা নিয়ে অসহায় মানুষদের জন্য কাজ শুরু করব ইনশাল্লাহ। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।
লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া-
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১:০০এএম/১২/৫/২০২০ইং)
আপনার মতামত লিখুন :