• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ অপরাহ্ন

বঞ্চিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে


প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৬, ২০১৯, ৮:৩৩ PM / ১২৭
বঞ্চিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে

মো. ওবায়দুর রহমান কুবাদ : ২০১৬ সাল। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রীতি অনুযায়ী বক্তব্য রাখার কথা সাধারণ স¤পাদকের। সেই বক্তব্য রাখতে মঞ্চে উঠলেন সৈয়দ আশরাফ। হাতে লিখিত বক্তব্য থাকলেও পড়লেন না সেটি। সবাইকে অনুরোধ করলেন সেই বক্তব্য পড়ে নিতে। তবে থেমে থাকলেন না। সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, ‘আওয়ামী লীগের আমি সন্তান, আওয়ামী লীগের ঘরেই আমার জন্ম। আওয়ামী লীগ যদি ব্যথা পায়, আমিও বুকে ব্যথা পাই। আওয়ামী লীগের কোনো কর্মী যদি ব্যথা পায়, আমারও অন্তরে ব্যথা লাগে। আওয়ামী লীগ তো আওয়ামী লীগই, এটা কোনো দল না, এটা আমার কাছে একটা অনুভূতির নাম।’
তৃণমূলের একজন কর্মী হিসেবে আমিও মনে করি আওয়ামী লীগ আমার কাছে একটি অনুভূতির নাম। কিন্তু বর্তমানে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী, কাউয়াদের ভিড়ে প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কতোটুকু মূল্যায়ন হচ্ছে – এটাই প্রশ্ন। তবে নিদ্বির্ধায় বলা যায়- আওয়ামী লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। সুবিধাভোগীরা দলে ঢুকে পদ-পদবী বাগিয়ে নিয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলকে করছে বিতর্কিত-প্রশ্নবিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ দলে যেভাবে অনুপ্রবেশকারীদের মূল্যায়ন এবং ত্যাগী-নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের অবজ্ঞা করা হচ্ছে; তাতে আমি আগামী দিনের আওয়ামী লীগে কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হয়। নগর-শহর-গ্রাম প্রতিটি স্থানে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করছে অনুপ্রবেশকারীরা। ফলে জনপ্রিয় এই দলটির জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু কেন এই অবস্থা? অনেক গুলো কারণ এর পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এগুলো হল- যে কর্মীদের রাতদিন, নিদ্রাহীন, ই¯পাতকঠিন ঐক্য, পরিশ্রম আর ভালবাসায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, ক্ষমতায় বসেই নেতারা তাদের ভুলে যান। ফলে গুরুত্বহীন ও অপদার্থ কর্মী হিসেবে এক সময় আওয়ামী লীগের উচ্ছিষ্ট হিসেবে দল ও এলাকায় নিগৃহীত হতে হয় এবং দলীয় কার্যকরী ভূমিকা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তারা। অপরদিকে দল ক্ষমতায় গেলে নেতারা নিজেদের বলয় ভারী করতে বিএনপি-জামায়াত-শিবির কর্মীদের দলে বিভিন্ন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তারাই এলাকা ও নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কখনো তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের কথা ভাবেন না। তারা ব্যস্ত থাকেন অন্য দল থেকে আসা চাটুকারদের আবদার মিটাতে। ফলে দলের মধ্যে প্রতিপক্ষ তৈরি হয় এবং আওয়ামী লীগের একজন প্রকৃত কর্মী ক্ষমতায় থাকা সত্বেও উড়ে এসে জুড়ে অন্য দলে ঐ তাঁবেদার নেতার নিকট অপদস্থ, পর্যুদস্ত ও উপেক্ষিত হয়। এমন কি তাকেই আওয়ামী লীগবিরোধী চিহ্নিত করে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। অনেক সময় মামলা মোকদ্দমা ও মোকাবিলা করতে হয় প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের।
বিএনপি-জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা সব সময়ই কৌশলী। তারা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করলেও চিন্তা-চেতনায় বিএনপি-জামায়াত-শিবিরই থেকে যায়। আমাদের কিছু এমপি-মন্ত্রী বলয় বৃদ্ধির জন্য তাদের আশ্রয় দেন এবং সেই অনুপ্রবেশকারীরাই দলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগার সেজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে থাকে। তাদের কারণে আওয়ামী লীগের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দূরে সরে যান। অথবা বলতে হয়- এভাবে প্রিয়দল আওয়ামী লীগের কাছ থেকে দূরে সরে আসতে হয় তাদের। এরপর যা হবার তাই ঘটে- আওয়ামী লীগ নামধারী বিএনপি, জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা দলের মধ্যে বিভেদের বলয় তৈরি করে, দলের মধ্যে থেকে দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে, নানা অপকর্মের জাল বিস্তার ঘটায়। ফলে আওয়ামী লীগ হয় বিতর্কিত, হ্রাস পেতে থাকে জনপ্রিয়তা। অপরদিকে প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিজ দল ক্ষমতায় থাকা সত্বেও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন; মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকলে তাদের নেতাকর্মীদের দাপটে প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা টিকতে পারেন না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও প্রকৃত নেতাকর্মীরা যেমন নির্যাতনের শিকার হন, বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকলেও তারাই আবার নির্যাতনের শিকার হন। তখন বসন্তের কোকিলদের আর রাজপথে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে আর দেখা যায় না। কিন্তু তখন প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দলের দুঃসময়ে বুক বেধে দাঁড়ান, দলকে রক্ষা করেন।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই জনবান্ধব দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চেষ্টা করে আর বিএনপি-জামায়াত হয় কর্মীবান্ধব। আমরা যেমন জনবান্ধব আওয়ামী লীগ চাই, তেমনি আওয়ামী লীগকে কর্মীবান্ধব হিসেবেও দেখতে চাই। এ জন্য তৃণমূলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা অনুপ্রবেশকারীদের বিদায় করতে হবে। তা না হলে আওয়ামী লীগকে অন্ধকার পথে হাঁটতে হবে।
তবে এ কথা স্বীকার করতেই হয় জননেত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত কর্মীবান্ধব। তবে কর্মীদের জন্য নেত্রীর নেয়া পদক্ষেপগুলোর সুফল ভোগ করতে পারেন না তৃণমূল। তাই সিনিয়র নেতাদের এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনার পক্ষে সবকিছু একা করা সম্ভব নয়। আপনাদেরকে তৃণমূলের ভাষা আপনাদের বুঝতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগের আত্মা পড়ে আছে তৃণমূলে। অসংখ্য গরিব, দুঃখী, অসহায় কর্মীর ঘরে পড়েছে আওয়ামী লীগের আত্মা। আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। কর্মীদের ভালোবাসতে হবে। সহানুভূতি দেখাতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা আশা করি নেত্রীর নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল নেতারা অবশ্যই ভূমিকা রাখবেন। আওয়ামী লীগে উড়ে এসে জুড়ে বসাদের বিদায় করে বঞ্চিত প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রকৃত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকৃত নেতাকর্মী যাদের দল থেকে কৌশলে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের দলে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : মো. ওবায়দুর রহমান কুবাদ, সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা যুব-কমান্ড, সুনামগঞ্জ জেলা
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৮:৩৪পিএম/২৬/১১/২০১৯ইং)