

ঢাকারনিউজ২৪.কম, ডেস্ক : উত্তর কোরিয়া ছেড়ে পালাতে গেলে দেশটির অনেক নারীকেই পাচারের অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়। তেমনি একজন নারী মিসেস বি। যিনি নিজে পাচারের শিকার হয়ে পরবর্তী সময়ে একজন নারী পাচারকারী হয়ে উঠেছিলেন। তার জীবনের নানা কাহিনী ঘিরে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
১৭ ডিসেম্বর(সোমবার) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মিসেস বি’র পাচারকারী হয়ে উঠার গল্প।
উত্তর কোরিয়ায় মিসেস বি’র স্বামী ও দুই সন্তান রয়েছে। ২০০৩ সালে একজন দালাল বাড়িতে বয়স্কদের দেখাশোনার লোক হিসেবে কাজ দেওয়ার কথা বলে উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত পার করে মিসেস বি’কে চীনে নিয়ে যান এবং চীনের কিছু লোকের কাছে তাকে বিক্রি করে দেন। তখন মিসেস বি’র বয়স ছিল ৩৬ বছর।
মিসেস বি’র পরিকল্পনা ছিল এক বছর চীনে কাজ করে টাকা জমানোর পর তিনি উত্তর কোরিয়াতে ফিরে যাবেন। আর জমানো টাকা দিয়ে দেশে থাকা তার স্বামী এবং দুই সন্তানের খাওয়া-পরা চলে যাবে। কিন্তু চীনে পৌঁছানোর পরে তার ভুল ভাঙে। চীনের জিলিন প্রদেশের চাংচুনে এক চীনা পুরুষের হাতে তাকে ‘তুলে দেওয়া’ হয়।
ওই সময় দালালটি তাকে বলে ‘একজন চীনা লোকের সাথে কেবল এক বছর থাকো তারপর পালিয়ে যেও।’ এর পরই মিসেস বি’র জীবন পাল্টে যায়। যদিও এই নারী নিজেই পাচারের শিকার হওয়া একজন ভুক্তভোগী, তবু একটা সময় তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন মানব পাচারকারী।
উত্তর কোরিয়ার মেয়েদের চীনা পুরুষদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন মিসেস বি। বিবিসি কোরিয়ান সার্ভিসকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উত্তর কোরিয়ার অর্ধশত নারীকে তিনি চীনাদের কাছে বিক্রি করেছেন এবং দালাল হিসেবে প্রায় ৫০ জন উত্তর কোরীয়কে দক্ষিণ কোরিয়াতে পাঠানোর কাজ করেছেন।
এই কাজের জন্য প্রথমে চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এবং পরে চীন-লাওস সীমান্ত পেরিয়ে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াতে পৌঁছাতেন। মিসেস বি রাতারাতি মানব পাচারকারী হয়ে উঠেননি। প্রাথমিকভাবে তিনি চীনের একটি গরুর খামারে চাকরি করতেন। মাসে ৯ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রোজগার করতেন।
ওই ফার্মে কাজ করার সময় এক দালালের সহায়তায় সীমান্তে তিনি নিজের সন্তান আর উত্তর কোরিয়ান স্বামীকে একবার দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই সময় তার স্বামীকে অসহায় ও দরিদ্র অবস্থায় দেখে হতবাক হয়ে যান মিসেস বি। এর পরই অর্থের জন্য তিনি পাচারকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
মিসেস বি বলেন, ‘পরিবারের জন্য কিছু একটা করতে হবে -এটাই তখন আমার মাথার ভেতর ছিল। আমাকে প্রচুর টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে। কিন্তু আমার কোনো জাতীয়তা ছিল না, পরিচয় ছিল না সেসময় এবং ভালো কিছু রোজগারের মতো অনেক কাজই আমি কখনো করতে পারতাম না।’
মিসেস বি তার বড় ছেলেকে ২০০৯ সালে চীনে আনেন। কিন্তু তিন বছর কাটানোর পরও সে মা ও সৎ বাবার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিল না। তখন তার মা তাকে দক্ষিণ কোরিয়াতে চলে যেতে সহায়তা করেন। একইভাবে ২০১৩ সালে মিসেস বি তার ছোট ছেলে এবং উত্তর কোরীয় স্বামীকে দক্ষিণ কোরিয়াতে চলে যেতে সাহায্য করেন।
তবে দক্ষিণ কোরিয়াতে যাওয়ার আগে চীনে আসেন তারা এবং মিসেস বি ও তার চীনা স্বামীর সঙ্গে এক মাসেরও বেশি সময় থাকেন। মিসেস বি বলেন, ‘আমরা সবাই একই কক্ষের ভেতর ঘুমাতাম, আমি, আমার চীনা স্বামী, আমার উত্তর কোরিয়ান স্বামী এবং আমার ছোট ছেলেটি।’
মিসেস বি তার চীনা স্বামীকে কথা দিয়েছিলেন যে একবার দক্ষিণ কোরিয়াতে জায়গা করে নিতে পারলেই তার কাছে আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু সেটা আর ঘটেনি। মিসেস বি জানান, তাকে কিনে নেওয়া লোকটি ছিলেন অত্যন্ত সমঝদার এবং চমৎকার মানুষ।
মিসেস বি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম যে আমি সন্তান ধারণে সক্ষম কিন্তু যেহেতু আমার সন্তানদের কাছে উত্তর কোরিয়াতে আমার ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাই আমি আবার বাচ্চা নিতে চাইলাম না। এটা শুনে সে (চীনা নাগরিক) বলেছিল ‘‘ঠিক আছে’’। এজন্য তার প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করছিলাম।’
‘যেহেতু আমার জন্য সে সন্তানের মুখ দেখতে পেল না, তাই দায়িত্ববোধ থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে তার মৃত্যু পর্যন্ত তার পাশে থাকব আমি।’
২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া পৌঁছান এবং সেদেশের গোয়েন্দাদের জেরার মুখে পড়েন মিসেস বি। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাকে সন্দেহ করা হয়। কারণ তিনি একটা সময় চীনে আইস নামে একটি মাদক বিক্রি করতেন। মিসেস বি’র মতে, মুক্ত অবাধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া তাকে সুখী করার চেয়েও বেশি ‘বিতৃষ্ণা’ দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরীয় গোয়েন্দাদের ভাষ্য, যেহেতু মাদক বিক্রির অর্থ উত্তর কোরিয়াতে গিয়েছে সেহেতু তার স্পাই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেন মিসেস বি। তবে তাকে ও তার স্বামীকে ‘নন-প্রটেক্টেড’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। ফলে তারা নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন না।
অতীতের অপরাধের রেকর্ড আছে, যারা অন্তত ১০ বছর চীনে বসবাস করেছে এমন ব্যক্তিদের ‘নন-প্রটেক্টেড’ আখ্যা দেওয়া হয়। এ নিয়ে দক্ষিণ কোরীয় সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেন মিসেস বি। আর এতকিছু যখন ঘটছে তার মধ্যে মিসেস বি’র চীনা স্বামী আরেকজন নারীকে বিয়ে করে ফেলেছেন।
যদিও এরপরও দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল, যাকে তারা বলেন ‘কেবলই বন্ধুত্ব’। এখনো মেসেজ আদান-প্রদান হয় তাদের মধ্যে। তবে চীনা সেই লোকটি তার সঙ্গে প্রতারণার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন বলে জানান মিসেস বি। সিউলে এখন তার সময় কাটে কফি বিক্রি করে।
মিসেস বি জানান, এখন পাচার কিংবা চোরাচালান কোনোটির সাথেই আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘একটা সময় টাকা-পয়সাই ছিল আমার জন্য সবকিছু। কিন্তু এখন আর তেমন মনে হয় না। আমার বাচ্চাদের জন্য আমি সব ত্যাগ করেছি। এখন আমার ৫০ বছর বয়স। এবার আমি নিজের জন্য বাঁচতে চাই। নিজের খুশির জন্য।’
মিসেস বি’র জীবনের নানা কাহিনীকে উপজীব্য করে পরিচালক জিরো ইউন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। যার নাম ‘মিসেস বি, অ্যা নর্থ কোরিয়ান উম্যান’ অর্থাৎ ‘মিসেস বি, একজন উত্তর কোরীয় নারী’। যদিও সিনেমাটিতে তার জীবনের বিপরীত অনেক বিষয় উঠে এসেছে।
সিনেমাতে যেমন দেখানো হয়েছে- যার কাছে বিক্রি করে ওই নারীকে দেওয়া হয়েছিল, সেই চীনা লোকটির সঙ্গে ১০ বছর ধরে একসাথে থাকার পর তার প্রতি ভেতরে ভেতরে ওই নারীর অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। তবে মিসেস বি বলেন, ‘আমি মনে করি এটা মায়া, দুজন মানুষের একে অপরের প্রতি মায়া। ভালোবাসা নয়।’
মানব পাচারের ঘটনার দ্বারা অপ্রত্যাশিত রোমান্সের ঘটনা দেখে দর্শকরা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আর চলচ্চিত্র নির্মাতা জেরো ইয়ুন বলেন, ‘এই সিনেমাটি নির্মাণের যে যাত্রা, তা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। এটা তাকে সারা জীবনের জন্য বিশাল অভিজ্ঞতা দিয়েছে।’
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/১:৫৩পিএম/১৭/১২/২০১৮ইং)
আপনার মতামত লিখুন :