

কাজী আনিসুল হক : প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের আগে স্বাধীন বাংলা রাজ্য মাঝেমধ্যে সৃষ্টি হলেও স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র কোনদিন সৃষ্টি হয়নি। যেখানে জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি নিজের রাষ্ট্রের সংবিধানে জাতিসত্তার স্ফুরণ ঘটিয়ে নাগরিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ব্যক্তির পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য বাঙালি এক মরণপণ মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রাম করেছিল। বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি তার হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালেই ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্থানের ঔপনিবেশিক শাসনকে পরাজিত করে ছিনিয়ে এনেছিল বাঙালির প্রথম রাষ্ট্র স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র।
‘বাংলাদেশ’ এর পেছনে ফিরি তো দেখতে পাই বাঙালি তার নিজস্ব জাতিসত্তাকে কয়েক হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে আজকের রূপ দেয়। এই বাংলা অঞ্চলেই এক সময় পুন্ড্রবর্ধন, সুম্ম, রাঢ়, হরিকেল, বরেন্দ্র প্রভৃতি উপজাতি তাদের নাম অনুসারে বসতি স্থাপন করেছিল। এসব নামের বিভিন্ন অঞ্চল বা রাজ্যসত্তার অস্তিত্বও ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়। রাজা শশাঙ্ক, পাল সা¤্রাজ্য, সেন রাজা, সুলতানী আমলের স্বাধীন পাঠান সুলতানরা বাংলা অঞ্চলকে প্রায় বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের শেষ ভাগে মুর্শিদকুলী খাঁ, আলিবর্দি খাঁ, সিরাজদ্দৌলা দিল্লির প্রতি নামমাত্র আনুগত্য স্বীকার করে প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে বাঙালির বাংলা কোনদিন রাষ্ট্রভাষা বা সরকারী ভাষার মর্যাদা পায় নি।
এর আগে ব্রিটিশ ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট দ্বিজাতিতত্ত্ব নামীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফলে হিন্দুস্থান ও পাকিস্থান অর্থাৎ হিন্দু মুসলিমের দুটি আলাদা দেশের জন্ম হয়। এর ফলে পাকিস্থানে তথা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে নজরুল চর্চাকে রাষ্ট্রীয় মদদে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু ঐ ভারত ভাগের বিপক্ষে ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্থাবে ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত হলে ১৯৪২ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম “বাঙালীর বাঙালা” শিরোনামে তার ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন: বাঙালিকে কিভাবে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে জেগে উঠতে হবে। বাংলার এই সবুজ শ্যামল বনভূমি, দিগন্ত বিস্থৃত ফসলের মাঠ, অবারিত আকাশ, সমুদ্রের গর্জন, নদীর ছলাৎ ছলাৎ প্রবাহমানতা সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে সে বলীয়ান কিন্তু ব্যক্তিক অর্থে তারা নিস্থেজ। একটি নিস্থেজ জাতিকে কিভাবে সবল, স্বাধীনতাকামী প্রতিবাদমুখর করে তুলতে হয় তা একজন কবির জানা। তাই তো কবি তার প্রাণশক্তি ক্ষাত্রশক্তি দিয়ে সত্যিকার অর্থেই জাতিকে জাগিয়ে তোলেন,স্বপ্ন দেখান। সেই রূপকল্পের ধারন করে শেখ মুজিবর রহমান হয়ে ওঠেন হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি রাজনৈতিক কবি জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।
কুসংস্কার আর সংকীর্ণ মানসিকতায় আচ্ছন্ন উগ্রপন্থী সাম্প্রদায়িকেরা তাঁকে বারবার বাঁধা দিয়েছে। দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক কবি জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো থেকেছেন আপোষহীন, কখনো প্রবল প্রতিবাদী। ১৯২৯ সালে কাজী নজরুলের দেখানো স্বপ্নকে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ পুনরায় উচ্চারন করেন রাজনৈতিক কবি জাতিপিতা শেখ মুজিবুর রহমান। যার যত বড় স্বপ্ন তিনি ঠিক তত বড়ই হন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন :
“কান্ডারী! তব সম্মুখে এ পলাশীর প্রান্তর
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর।
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উঠিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুর্নবার।”
নজরুলের এই উচ্চারণ ছিল বাঙালির স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা আমাদের বাঙালি জাতির বড় অর্জন। নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর চাওয়া ছিল এক ও অভিন্ন। তাইতো, পাকিস্থানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে দেয়া ভাষণে বলেন- কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তুমি এসে দেখে যাও- আমার বাঙালিরা মানুষ হয়েছে। তুমি বলেছিলে- ‘হে মুগ্ধ জননী, সাত কোটি সন্তানেরে রেখেছো বাঙালি করে
মানুষ করোনি’।
তোমার সে কথা আজ মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে ফেরার মাত্র চার মাস পর ২৪ মে নিস্তব্দ বিধ্বস্থ রণক্লান্ত কবি নজরুল ইসলামকে ভারতের কোলকাতা থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করেন এবং ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির পাশে ২৮ নং বাড়িটিকে ‘কবি ভবন’ নাম দিয়ে কবির স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে কবি নজরুলকে জাতীয় কবি অভিধায় ভূষিত করেন বা স্বীকৃতি দেন। ‘কবি ভবন’ বর্তমানে নজরুল ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। ১৯৭২ সালে প্রথম কবির জন্মজয়ন্তী সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল একাডেমীর ব্যানারে পালন করা হয়।
নজরুল ইসলামের ত্রিশ বছর বয়সে ১৯২৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর কোলকাতার এলবার্ট হলে “বাঙালি জাতির জাতীয় কবি” অভিধায় সংবর্ধিত করা হয়। হিন্দু মুসলিম মিলিত উদ্যোগের সে অনুষ্ঠানে বিজ্ঞানাচার্য স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায় সভাপতির ভাষণে বলেন-
আমরা আগামী সংগ্রামে নজরুলের সঙ্গীত কণ্ঠে ধারণ করিয়া শ্রী মান সুভাসের মত তরূণ নেতাদের অনুসরণ করিব।
১৩৪৯ সালের ৩ বৈশাখ ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কাব্যছন্দে বাংলাদেশের রোডম্যাপ এঁকে দেন-
‘এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির, আমাদের
দিয়া প্রহারেণ ধনঞ্জয়
তাড়াবো আমরা করি না ভয়
যত পরদেশী দস্যু ডাকাত
রামাদের, গামাদের।’
বাঙলা ও বাঙালির স্বাধীনতার “মন্ত্র” সব বাঙালি শিশুদের মন-মননে অস্থি ও মজ্জায় গেঁথে দিতেও আহ্বান জানান কবি নজরুল ইসলাম। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হওয়ার প্রায় ত্রিশ বছর আগে তার রূপকল্প বাঙালি জাতির সামনে সুস্পষ্টভাবে হাজির করেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
ব্রিটিশ ভারতে নজরুল জন্ম নিয়ে যে বিদ্রোহের বীজ বপন করেছিলেন, সেই বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় ৫২ ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা। এমনকি তার ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তগত “পূর্ণ অভিনন্দন” কবিতা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানটি গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অসাধারণ ভাষণে বাঙালি জনগণের স্বাধীনতার চরম আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন। বাঙালির ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে এক অনন্য আবেগে তীব্র জ্বালাময়ী ভাষায় বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পেরিক্লিসের পেলোপোনেসিয়ান, আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ এবং উইনস্টন চার্চিলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাষণের সঙ্গে এই ভাষণটি বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্যতায় স্থান করে নিয়েছে। বস্তুত নজরুল সাহিত্যের রাজনৈতিক প্রকাশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক।
মুঠোফোনঃ+৮৮০১৮১৯৮০৮৩০৯
মেইল: kajeanisulhaque@gmail.com
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৭:৫৫পিএম/১৬/৩/২০২০ইং)
আপনার মতামত লিখুন :