

ঢাকারনিউজ২৪.কম, ডেস্ক : চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগমুহূর্তে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে পরিবারের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড প্রকাশের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে একরামুলের পরিবারের প্রকাশ করা এই অডিও রেকর্ড এখন সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সরাসরি গুলি করে একরামুলকে হত্যার চাঞ্চল্যকর দৃশ্যপট প্রকাশ পায়। তবে কে বা কারা এ গুলি করে সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি অডিও রেকর্ড থেকে।
একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম তার দুই মেয়েকে নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে চারটি ক্লিপ মিলিয়ে ১৪ মিনিট ২২ সেকেন্ডের এই অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। এতে কয়েকজনের কণ্ঠ, গুলির শব্দ, চিৎকার ও গালিগালাজ শোনা যায়।
সাংবাদিকদের এ অডিও রেকর্ড শুনিয়ে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম অভিযোগ করেন, বন্দুকযুদ্ধের নামে তার স্বামীকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার স্বামী হত্যার বিচার দাবি করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আয়েশা অভিযোগ করে বলেন, ‘২৬ মে রাতে নয়টার দিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মেজর পরিচয় দিয়ে আমার স্বামীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত এগারটার পরেও বাসায় না ফিরলে আমার স্বামীর সংগে ফোনে মেয়ে কথা বলে। তখন কণ্ঠে আতঙ্ক ছিল। এরপর থেকে আমার মোবাইলটি সারাক্ষণ খোলা ছিল। এতে কথা রেকর্ড হচ্ছিল। ওই দিন রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিৎকার ও গুলির শব্দ শুনেই আমি ও আমার পরিবার আঁতকে উঠি। তখনই বুঝতে পারি আমার স্বামীকে অন্যায়ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
এ অডিও একরামুলের কিনা সেটা সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ না হলেও সাংবাদিকদের কাছে তার পরিবার দাবি করেছেন, এটি একরামুলের সাথে তাদের কথোপকথন। একরামের ফোন খোলা ছিল বলে এ প্রান্তে পরিবারের সাথে পুরো কথাবার্তা অটোরেকর্ডে রেকর্ড হয়েছে।
অডিও ক্লিপগুলো সম্পর্কে আয়েশা বলেন, এর মধ্যে তিনটি অডিওতে তার স্বামী একরামুল ও মেয়ের কণ্ঠ এবং আরেকটি অডিওতে মেয়েদের পাশাপাশি তার নিজের কণ্ঠ রয়েছে।
আয়েশা বেগম দাবি করেন, সেদিন রাত ১১টা ৩২ মিনিটের পর তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবেই ঠাণ্ডা মাথায় এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে সেটা মোবাইলের এই রেকর্ড যাচাই করলেই তা বোঝা যাবে।
অডিওগুলোতে শোনা যায়, একরামুল তার মেয়েকে ফোন করে বলেছেন, এক মেজর সাহেবের সাথে দেখা করতে গেছেন তিনি । এরপর ইউএনও অফিসে যাচ্ছেন। মেয়ে তাকে কখন বাসায় ফিরবে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তার ফিরতে বেশি দেরি হবে না।’ এভাবে আরও দু’দফায় মেয়ের সাথে কথোপকথনে একরামুল বলেন, ‘তিনি একটা কাজে হ্নীলা যাচ্ছেন।’ কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভেঙ্গে আসলে তার মেয়ে বলে, ‘আব্বু তুমি কাঁদছ?’ গাড়ি চালাচ্ছেন বলে মেয়েকে কোন উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি। সর্বশেষ অডিওতে, তার স্ত্রী স্বামীর খোঁজ নেওয়ার জন্যে ফোন করলে ১১টা ৩২ মিনিটে ফোনটি রিসিভ করা হয়। এতে একরামুলের কোন কণ্ঠ পাওয়া যায় না। এসময় আয়েশা বারবার বলছিলেন, ‘আমি কমিশনারের কথা বলতে চাচ্ছি, আমি উনার মিসেস বলছি’। তখন ও প্রান্তে একের পর এক গুলির শব্দ, পুলিশের সাইরেন, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি ও গালিগালাজ শোনা যায়। গুলির শব্দ শুনেই এ প্রান্তে একরামুলের স্ত্রী ও মেয়েরা কান্নায় আহাজারিতে ভেঙ্গে পড়ে। স্ত্রী চিৎকার করে ওঠে বলে উঠেন, ‘ও আল্লাহ…আমার স্বামী নির্দোষ, আপনারা উনাকে মারছেন কেন উনি কিছু করেন নাই । উনাকে কেন গালি দিচ্ছেন আপনারা?’
এদিকে এ অডিও রেকর্ড বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। একটি সংবাদ মাধ্যমকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান জানান, আইনকে ‘পাশ কাটিয়ে’ কাজ করতে গেলে যে বিপদ ঘটতে পারে, একরামের ঘটনায় তা ‘স্পষ্ট হয়ে গেছে’। একইভাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান একে বর্ণনা করেছেন ন্যায় বিচার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে।
তবে একরামুল নিহতের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে র্যাব এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করে, যুবলীগ নেতা একরামুল ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার ছিলেন। এতে দাবি করা হয়, একরামুল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। যদিও তার পরিবার বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে তারা অটল থাকে।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে একরামুলের পরিবারের দেয়া অডিও রেকর্ডগুলো বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হবার পর টেপটি খতিয়ে দেখছে র্যাব সদর দফতর। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান শুক্রবার একথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে অডিও রেকর্ডের কথা বলা হচ্ছে আমরা তা আমলে নিয়ে খতিয়ে দেখছি।’
https://youtu.be/6oH_oTYuk4A
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৮:৩৮এএম/২/৬/২০১৮ইং)
আপনার মতামত লিখুন :