• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ন

অবশেষে সেই পরিবারটির ঠাঁই হলো কুড়িগ্রামের পাঁচগাছিতে


প্রকাশের সময় : জুলাই ১৩, ২০১৮, ১১:৩১ PM / ১৩৯
অবশেষে সেই পরিবারটির ঠাঁই হলো কুড়িগ্রামের পাঁচগাছিতে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : ঢাকায় ওভার ব্রীজের নিচে আশ্রয় নেয়া অসুস্থ্য মা, তার স্বামী ও সন্তানদের অবশেষে ঠাঁই হলো কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে। জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টায় পরিবারটিকে সদর ইউএনও আমিন আল পারভেজ, এনডিসি সুদীপ্ত কুমার সিংহ এবং কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এড. আহসান হাবীব নীলু তাদেরকে পাঁচগাছিতে নিয়ে যান। এরআগে রাতের কোচে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন ঢাকাস্থ কুড়িগ্রাম সমিতির মহাসচিব সাদুল আবেদীন ডলার। সকাল  ৭টায় পরিবারের সদস্যরা কুড়িগ্রাম শহরে পৌঁছলে তাদেরকে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে নিয়ে আসা হয়। এখানে নিজের জীবনের কথা শোনান ফরিদা বেগম (৪০) ও তার স্বামী আনছার আলী (৬০)।
জেলার উলিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ইসলামপুর মৌজার মরাকাটি গ্রামে বাড়ি ছিল ফরিদার স্বামী আনছার আলীর। ছিল ২ একরের বেশি ধানী জমি। দুধের ব্যবসা করে ভালই চলছিল পরিবারটি। চরের মধ্যে প্রতিদিন ২ মণ করে দুধ সংগ্রহ করে ১৫ কি.মি. সাইকেল মাড়িয়ে কুড়িগ্রাম শহরের হোটেল গুলোতে দুধ বিক্রি করতেন তিনি। এভাবেই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু ব্রহ্মপূত্র নদের করাল গ্রাসে ২০১৬ সালে একমাসের মধ্যে বাড়ীঘর, আবাদি জমি সব বিলিন হয়ে যান। গৃহহীন হয়ে পরে গৃহস্ত পরিবারটি। তাদের সাথে আরো দেড়শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ফেলে। শেষে আশ্রয় মেলে ইসলামপুরে জ্যাঠাত ভাইয়ের গোয়াল ঘরে। সেখানে একমাস থাকার পর ঢাকায় চলে আসে পরিবারটি।
ফরিদা বেগম জানান, বাপুরে অনেক কষ্টের জীবন মোর। মুই জন্মানো সাত দিনের মাথায় মোর মা মরি যায়। এরপর বাপ কটে চলি গেছে কায়ও কবার পায় না। এতিম ছওয়ার কাঁইয়ো দায়ভার নেয় নাই। ৫ বছর বয়সোত অভাবোত পরি মোর নানী কুলসুম আর খালা তারামনি মোক সিতাইঝাড়োত ছিন্নমুকুল এনজিওত থুইয়া আইসে। সেটে ৭ বছর থাকপের পর ক্লাস সিক্সত পড়বের সময় ছিন্নমুকুল উঠিয়া যায়। মুই নানীর বাড়িত ফিরি আইসং। সেটে মোর বিয়ে দেওয়া হয়। সেই বিয়া ৩ মাসের মাথায় ভাঙি যায়। ইয়ার দুই বছর পর বর্তমান স্বামী আনছার আলীর সাথে মোর বিয়ে হয়। ওমারও এটা দ্বিতীয় বিয়েও। ওমার প্রথম বউ আমেনা ডায়রিয়া হয়া মরি যায়।
এই হল ভাঙন কবলিত আনছার আলী আর ফরিদা বেগমের জীবন কাহিনী। অভাব-অনটন আর মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে তারা নভেম্বর মাসে ঢাকায় পাড়ি দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে শেষে আশ্রয় নেয় কলাবাগান ওভার ব্রীজের নীচে পলিথিনের টাবু টানয়ে বসবাস করতেন তারা। এখানে ধানমন্ডী ক্রীড়া চক্রক্লাবে দাঁড়োয়ান ভাই জামালের সহযোগিতায় মাঠের পাতা কুড়ার কাজ করে দিনে আয় হয় দুশো থেকে আড়াইশ টাকা। সেই অর্থেই চলছিল মানবেতর জীবন যাপন। মাঝখানে কাজটাও বন্ধ হয়ে যায়। এসময় খেয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছিল পরিবারটিকে। সন্তানদের দু:খ-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ্য শরীর নিয়ে নিজেই ভিক্ষাবৃত্তি করতে বেড়িয়ে পরেন ফরিদা বেগম। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে আকলিমা (১১) একজন প্রতিবন্ধী (বামন) এবং সাড়ে তিন বছরের ছোট ছেলে ফরিদুল ইসলামকে নিয়ে তারা থাকতেন। দ্বিতীয় কন্যা আখিতারা (৭) থাকত গ্রামের বাড়িতে চাচীর কাছে।
ফরিদা বেগম আরো বলেন, ঘটনার দিন দু’সন্তানকে নিয়ে কলাবাগান থেকে ল্যাব এইডের দিকে ভিক্ষা করতে বের হন। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে বের হওয়ার ফলে ল্যাব এইডের কাছে অসুস্থ্য হয়ে ফুটপাতেই পরে যান তিনি। সেই স্মৃতি মনে করে ফরিদা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ছওয়া দুইটা না খায়া আছে। মা হয়া কেমন করি বসি থাকং। অসুস্থ্য শরীর নিয়া তাই ভিক্ষা করার জন্যে বের হয়া পড়ং। ঘোড়ের মইধ্যে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় চোখ মুখ আন্ধার দেখি সেটেই উল্টি পড়ং। মনে হবার নাগছিল আজক্যা মনে হয় মোর শ্যাষ দিন। বড় বেটি মোক ধরি থাকে। আর ছোট বেটা সোবহানবাগ মসজিদ থেকে বোতলত করি পানি নিয়া আসি মোর মাথাত ঢালে। তারপর কি হইল কাঁই জানে। মোক পরদিনোত লোকজন হাসপাতালোত নিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া কুড়িগ্রামের এই পরিবারটির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেন জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন। সন্তানসহ পুরো পরিবারটি কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে আসলে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র দেন সিভিল সার্জন ডা: এসএম আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম। এ সময় প্রাথমিকভাবে পরিবারটির খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, লবণসহ সমস্ত উপকরণ সরবরাহ করেন কুড়িগ্রাম রেল-পরিবেশ যোগাযোগ উন্নয়ন গণকমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম ।
কুড়িগ্রাম গণকমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা কুড়িগ্রামের উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছি। আমাদের ১২টি দাবির সাথে কুড়িগ্রামের সকল ভূমিহীনদের পূণর্বাসন চাই দাবিটি সংযুক্ত করছি।
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এড. আহসান হাবীব নীলু জানান, জেলায় বন্যা আর নদী ভাঙনে প্রতি বছর শত শত পরিবার বাড়ি ভিটা হারাচ্ছে। নদী তীরবর্তী উন্মুক্ত এলাকায় নদী শাসনের ব্যবস্থা না করায় বানভাসী ও গৃহহীনদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফরিদার মতো হাজারও মানুষ এখন বড়বড় শহরের পথে ঘাটে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসব মানুষদের পুণর্বাসন করা জরুরী।
সিভিল সার্জন ডা: এসএম আমিনুল ইসলাম জানান, নিয়মিত খাদ্য আর পুষ্টির অভাবে পুরো পরিবারটি স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছে। খাবার ও প্রযোজনীয় ঔষধপত্র পেলে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন আল পারভেজ জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন এ পরিবারটিকে অস্থায়ী ভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীনের নির্দেশে তাঁদের তিন সন্তানকে স্কুলে ভর্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন জানান, সরকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সকলের উচিৎ সরকারের এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়ানো। অসহায় ফরিদার পরিবারকে জমিসহ স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। একই সাথে করা হবে কর্মসংস্থানের।

(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১১:৩০পিএম/১৩/৭/২০১৮ইং)