• ঢাকা
  • বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

‘সুরঞ্জিতের আসনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোট প্রার্থনায় তিন প্রার্থী মরিয়া


প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৬, ১০:৪৬ PM / ৩১৬
‘সুরঞ্জিতের আসনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোট প্রার্থনায় তিন প্রার্থী মরিয়া

নাইম তালুকদার, সুনামগঞ্জ : ​দীর্ঘ পাচঁপান্ন বছর ধরে ভাটির জনপদ চিনেছে কেবল একজনকেই—সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত—সেই সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের নির্বাচনী মানচিত্র এবার পরিবর্তন । একাত্তর-পরবর্তী প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘নৌকা’ আর ‘সেন পরিবার’ এবার নেই নির্বাচনের মাঠে । আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া এবং জয়া সেনগুপ্তের ভোট বর্জনের ডাকের ফলে তৈরি হওয়া এই বিশাল ‘রাজনৈতিক শূন্যতা’ দখলে নিতে এখন মরিয়া লড়াই চলছে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী অন্যান্য দলের মনোনীত প্রার্থীদের।

​দিরাই-শাল্লার রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন এক ভাটির নক্ষত্র । তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্ত সেই ধারা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট এখন কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে চলছে সাধারণ ভোটারদের মনে জল্পনা কল্পনা ।

​মঙ্গলবার শাল্লার হবিবপুর ইউনিয়নের শাসখাই বাজারে সমাবেশ করেন বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী। ঠিক তার পরদিনই একই স্থানে বিশাল জমায়েত করেন জামায়াতের প্রার্থী শিশির মনির। উভয় সমাবেশেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। রাজনীতিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন ‘সুরঞ্জিতের আমানত’ লুফে নেওয়ার প্রতিযোগিতা হিসেবে।

​বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হারানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তাঁর সমর্থকদের দাবি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে যারা এতদিন নাছির চৌধুরীকে ভোট দিতে পারেননি, এবার তারা দলবেঁধে ধানের শীষে ভোট দেবেন। নাছির চৌধুরীর হয়ে জনসভায় সুরঞ্জিত-অনুসারী অনেক সংখ্যালঘু নেতার বক্তব্য দেওয়া সেই ইঙ্গিতই বহন করছে।

​অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী শিশির মনির নিজেকে তুলে ধরছেন ‘ত্রাতা’ হিসেবে। সাম্প্রতিক প্রতিকূল সময়ে দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে আইনি ও মানবিক সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর সমাবেশে রবীন্দ্র দাস, রথীন্দ্র দাস বা মন্টু দাসের মতো সংখ্যালঘু নেতাদের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।

​আসনটির সর্বশেষ সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্ত এবার ভোটে নেই। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা ভোট বর্জনের পথে হাঁটছেন। এই ডাক সাধারণ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বড় বাধা হতে পারে। দিরাই-শাল্লার প্রায় ২০ শতাংশ ভাসমান বা নীরব ভোটার এবং ৪০ শতাংশ আওয়ামী ঘরানার ভোটারই এবার জয়ের চাবিকাঠি। তারা যদি কেন্দ্রে না যান, তবে ভোটের হার যেমন কমবে, তেমনি পাল্টে যাবে জয়-পরাজয়ের হিসাব।

​২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিবিহীন ভোটে তা নেমে আসে ৪৫.৯১ শতাংশে। এবার সব দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ থাকলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সেই পরিসংখ্যানে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় স্থানীয়রা।

​নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও শিশির মনিরের দ্বৈরথের মাঝে মাঠ ছাড়ছেন না সিপিবির নিরঞ্জন দাস খোকন। ‘কাস্তে’ প্রতীক নিয়ে তিনিও চেষ্টা করছেন বামপন্থি ও প্রগতিশীল ভোটারদের মন জয় করতে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্মৃতিকে পুঁজি করে এবং আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে টার্গেট করে দিরাই-শাল্লায় এখন চলছে ভোটের কাড়াকাড়ি। বিএনপি চায় হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে, আর জামায়াত চাইছে আইনি ও সামাজিক ইমেজে ভর করে নতুন ইতিহাস গড়তে। ড. জয়া সেনগুপ্তের ‘ভোট বর্জন’ আর প্রার্থীদের ‘ভোট টানার’ এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটই দেবে চূড়ান্ত রায়।