• ঢাকা
  • শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন

হালান্ডকে গার্দিওলার কড়া ধমক!


প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৮, ২০২৬, ৬:৫৪ PM / ৩৯
হালান্ডকে গার্দিওলার কড়া ধমক!

স্পোর্টস ডেস্ক : ম্যানচেস্টার সিটির কোচ হিসেবে শেষ কয়েকটি মৌসুমে পেপ গার্দিওলার কঠোরতা, আবেগ ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা অধ্যায় এবার উঠে এসেছে নতুন এক তথ্যচিত্রে। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর ‘আ বিউটিফুল অবসেশন’ নামের এই তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, দলের তারকা ফুটবলারদের সঙ্গেও প্রয়োজনের সময় কতটা কঠোর হয়ে উঠতেন এই স্প্যানিশ কোচ।

তথ্যচিত্রের তৃতীয় পর্বে এমনই একটি দৃশ্য রয়েছে নরওয়ের তারকা ফরোয়ার্ড আরলিং হালান্ডকে ঘিরে। এফএ কাপের ফাইনালে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ম্যাচের বিরতিতে হালান্ডকে রীতিমতো ধমক দেন গার্দিওলা। ওয়েম্বলির ড্রেসিংরুমে কোচের সেই বক্তব্যে ফুটে ওঠে দলের প্রতি তার প্রত্যাশা এবং হালান্ডের কাছ থেকে তিনি ঠিক কী ধরনের পারফরম্যান্স চাইছিলেন।

প্রথমে গার্দিওলা হালান্ডকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন? হালান্ড ক্লান্ত নন জানালে আরও চড়া স্বরে কথা বলতে শুরু করেন সিটি কোচ।

‘সালিবা এবং ওই ফাইনালের অন্য সব খেলোয়াড়ের সঙ্গে যেভাবে বলের জন্য লড়াই করেছিলে, এখন সেভাবে লড়াই করছ না কেন? তুমি যদি ক্লান্ত হয়ে থাকো, এখনই আমাকে বলো। আমি ছয়জন খেলোয়াড়কে বাইরে রেখেছি। ছয়জন খেলোয়াড়কে বাইরে রাখার জন্য আমার লজ্জা লাগছে। তোমার মান কোথায়? রক্ষণভাগের পেছনে তোমার দৌড় কোথায়? বক্সে তোমার উপস্থিতি কোথায়?’- হালান্ডকে বলেন গার্দিওলা।

তবে কিছুক্ষণ পরই নিজের সুর কিছুটা নরম করেন তিনি। কঠোরতার আড়ালে যে হালান্ডের প্রতি তার আস্থাও রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করে দেন। ‘আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি, আরলিং। বাবার মতোই ভালোবাসি। কিন্তু বিষয়টা সেটা নয়। তুমি জিততে চাও- সেটা দেখাও,’ বলেন গার্দিওলা।

গার্দিওলার এমন বক্তব্য শুধু একজন তারকা ফুটবলারের প্রতি কোচের রাগ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজের সেরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তিনি কতটা তীব্রতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করেন, সেটিও সামনে এনেছে।

‘আ বিউটিফুল অবসেশন’ মূলত ম্যানচেস্টার সিটিতে গার্দিওলার শেষ কয়েকটি মৌসুমের অন্তরালের গল্প নিয়ে তৈরি। চার পর্বের এই তথ্যচিত্রে এমন অনেক মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো সাধারণত ড্রেসিংরুমের দরজার ভেতরেই থেকে যায়। খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক, বোর্ডের সঙ্গে মতবিরোধ, দলের কঠিন সময় এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা- সবই জায়গা পেয়েছে এতে।

তথ্যচিত্রে গার্দিওলার আরেকটি উত্তপ্ত মুহূর্ত দেখা গেছে সাবেক সিটি অধিনায়ক কাইল ওয়াকারের সঙ্গে। লিভারপুলের মাঠ অ্যানফিল্ডে হারের পর ওয়াকারের একটি বল হারানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছিলেন গার্দিওলা। দলের সভাগুলোতে বারবার নিজের নাম উল্লেখ করা নিয়ে আপত্তি জানান ওয়াকার।

‘আপনি প্রতিটি মিটিংয়ে আমার নাম বলেন। প্রতিটিতেই আমার নাম,’ গার্দিওলাকে বলেন ওয়াকার। জবাবে গার্দিওলার সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘হয়তো তুমি অধিনায়ক বলেই।’

তথ্যচিত্রের সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর একটি আসে ম্যানচেস্টার সিটির কঠিন সময়ের মধ্যে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে দলের পারফরম্যান্সে যখন হতাশা বাড়ছিল, তখন খেলোয়াড়দের মধ্যে আরও আবেগ, তাড়না ও জয়ের ক্ষুধা তৈরি করতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টানেন গার্দিওলা।

সেই সময় নিজের বিবাহবিচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি খেলোয়াড়দের বোঝানোর চেষ্টা করেন, শুধু ভালোবাসা থাকলেই হয় না, যেকোনো সম্পর্ক বা কাজকে এগিয়ে নিতে আবেগ ও তাড়নাও প্রয়োজন।

‘আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, আমার স্ত্রী- এখন সাবেক স্ত্রী- ১তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। আমি তাকে খুব ভালোবাসি, কিন্তু আমরা আমাদের আবেগ হারিয়েছি। আমি কি তাকে ভালোবাসি? হ্যাঁ। সে কি আমাকে ভালোবাসে? হ্যাঁ। কিন্তু আমরা আবেগটা হারিয়ে ফেলেছি। জীবনে যা কিছু করো, আবেগ নিয়ে করো। আমি ভালো খেলোয়াড় চাই না, আমি আবেগ নিয়ে খেলা খেলোয়াড় চাই,’- খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন গার্দিওলা।

গার্দিওলার দীর্ঘদিনের কোচিং স্টাফের সদস্য মানেল এস্টিয়ার্তেও তথ্যচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গার্দিওলার আচরণে পরিবর্তন নিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল তাকে। কোচের ব্যক্তিগত জীবনে চলা নানা সমস্যার কারণেই তার আচরণে এমন পরিবর্তন এসেছিল বলে খেলোয়াড়দের বোঝানোর চেষ্টা করেন এস্টিয়ার্তে।

তবে শুধু খেলোয়াড়দের সঙ্গেই নয়, ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গেও গার্দিওলার মতপার্থক্যের মুহূর্ত উঠে এসেছে তথ্যচিত্রে।

এক ম্যাচে একসঙ্গে ১০টি পরিবর্তন আনার পর ক্লাবের প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানো এবং সভাপতি খালদুন আল মুবারকের ভয়েসমেসেজে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরক্তি প্রকাশের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে গার্দিওলার আরেকটি কঠোর বার্তাও দেখা গেছে। মৌসুম শেষে কোনো খেলোয়াড়ের মুখে হতাশা বা কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ তিনি মেনে নেবেন না—সেটি স্পষ্ট করে দেন সিটি কোচ।

‘মৌসুমের শেষে যদি তোমাদের মুখে দুঃখ দেখি, আমি তোমাদের মেরে ফেলব। আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমাদের অভিযোগ করতে দেখলে, আমি তোমাদের মেরে ফেলব,’—রসিকতা মেশানো কঠোর ভাষায় খেলোয়াড়দের বলেন তিনি।

এরপর প্রত্যেক খেলোয়াড়কে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে একাদশে জায়গা করে নেওয়ার আহ্বান জানান গার্দিওলা।

তবে তথ্যচিত্রের শেষদিকে আবেগের আবহ আরও ঘনীভূত হয়। ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার সিদ্ধান্তটি খেলোয়াড়দের জানানোর মুহূর্তও দেখানো হয়েছে এতে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাবটির দায়িত্ব পালন, একের পর এক সাফল্য এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনার পর নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন গার্দিওলা।

খেলোয়াড়দের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেন যাচ্ছেন- সেটির নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানতে না চাইতে। তবে নিজের ভেতরে তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।

‘আমাকে জিজ্ঞেস করো না কেন আমি চলে যাচ্ছি। কোনো কারণ নেই। কিন্তু গভীরে আমি জানি, আমার সময় এসে গেছে। আমাকে অনেক কিছু নতুন করে সাজাতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক কিছু ঘটেছে এবং পেশাগতভাবেও আমার অন্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি দরকার একটু স্বস্তি পাওয়া এবং সময়কে এগিয়ে যেতে দেখা।’

ম্যানচেস্টার সিটির সোনালি যুগের অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন গার্দিওলা। মাঠের বাইরে তার কঠোরতা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত আবেগ নিয়ে এতটা খোলামেলা দৃশ্য সাধারণত দেখা যায়নি। নতুন তথ্যচিত্রটি সেই অদৃশ্য জগতের দরজা খুলে দিয়েছে।

আর হালান্ডকে দেওয়া সেই ধমক যেন গার্দিওলার কোচিং দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি—দলের সবচেয়ে বড় তারকা হলেও কারও জন্য প্রত্যাশার মানদণ্ড কমে না। বরং বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়দের কাছ থেকেই তিনি চান আরও বেশি দায়িত্ব, আরও বেশি আবেগ এবং জয়ের জন্য আরও বেশি ক্ষুধা।