• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০১:৫৭ অপরাহ্ন

মহাদেবী চন্ডী


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৩, ২০২৪, ১২:২৪ PM / ৩৫২
মহাদেবী চন্ডী

রণজিৎ মোদক : অমানিশার অন্ধকার ভেদ করে আলোর বন্যায় জগত আলোকিত করেন যোগেশ্বরী মহামায়া। সনাতনী হিন্দু যার পূজার উৎসবে মেতে ওঠে। যাঁর কাছে সম্পদের জন্য বর চায়, শত্রু দমনের জন্য চায় শক্তি, আপদ বিপদে চায় অভয় আর মরণে চায় মোক্ষ। সেই মহাদেবীর কথাই মাকেন্ডীয় পুরানে বর্ণনা করা হয়েছে সেই পুরাণের দেবী হচ্ছেন চন্ডী। মহালয়ার মহাক্ষণে তাঁর আবির্ভাব। পিতৃপক্ষের শুরু।

দেবী চন্ডিকার অষ্টোত্তর শত নামে ভূষিত। জয় দুর্গা, দুঃখহরা কৃতান্ডদলনী, মহামায়া, কালজয়া, কাত্যায়নী, উমা, ভবেশঘরনী, দয়াময়ী, করালিনী, কপালমালিকে, কালিকে, কীর্ত্তিবাসপ্রিয়া, মহারাত্রি মহোদরী, সুরেশ্বরী, শংকরী, ব্রহ্মান্ড জননী, শিবানী, সত্য সনাতনী, ভবানী, অন্নপূর্ণা, মহেশ্বরী, জগততারিনী, ভগবতী, অগতির গতি, সর্ব্বানী, ঈশ্বানী, ইন্দ্রানী, ঈশ্বরী, ঈশ্বর জায়া, উগ্রচন্ডা, অপরাজিতা, উর্ব্বশী, রাজরাজেশ্বরী, ষোড়শী, মাতঙ্গী বগলা, কল্যাণী কমলা, গায়ত্রী, ভুবনেশ্বরী সর্ব্ববিশ্বোদরী, শুভঙ্করী, ক্ষেমঙ্করী, ছিন্নমস্তা, মহিষমর্দ্দিনী, সুবদনী, নন্দিনী, দিগম্বর ঘরনী, দেবী দিগম্বরী, শিবে, শবারূড়া চন্ডী, চন্দ্রচূড়া, এলোকেশী, শারদা, বরদা, শুভদাসুখদা, অন্নদা শ্যামা, মৃগেশবাহিনী, মহেশভাবিনী, বামা, কামাক্ষারুদ্রাণী, হরাহররানী, শমনত্রাসিনী, অরিষ্টনাশিনী, দাক্ষায়নী, পার্ব্বতী, ওমা ভগবতী, শংকর সুন্দরী, শিবা শাকম্ভরী, শ্যামা, শিব সহচরী, মায়া মহোদরী, হররমা, ত্রিতাপহারিনী, করালী বিমলা, অভয়া, অম্বেঅম্বিকে ভবরানী, মনোহরা ব্রহ্মানী, রুদ্রানী নিতম্বিণী, অরিষ্ট স্তম্ভিণী, নরদ্বাত্রী, অর্পণা, অন্নদা, সারদা, সর্বসিদ্ধিদাত্রী, চামুন্ডে, চন্ডিকে, নারায়নী, শিবদারা কান্তিকরী, ক্ষেমংকরী তারা, কপালিনী, মৃগাঙ্ক আননী, ভীমে, নৃমুন্ডমালিণী, গিরীন্দ্র নন্দিনী, গিরীশ বন্দিনী, গৌরী, গান্ধারী, গোঃগজ জননী, গোপেশ কুমারী, গোবিন্দ ভগিনী, যোগিনী, পরাপরায়নী, দাক্ষায়নী, চন্দ্রচূড়া হরসিংহারুঢ়া, মেনকা দুলালী, চন্ডিকা, ভদ্রকালী, মহাকালী, বৈষ্ণবী জম্ভিনী, ভৈরবী বিজয়াজয়া, মন্মমথিনী, মহিষঘাতিনী।

এখানে চন্ডী গ্রন্থানুসারে একশত আটটি নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নামি এবং নামের যে কী শক্তি তা শাস্ত্রিয় গ্রন্থে লক্ষ্য করা যায়। পুরাকালে সৃষ্টিতত্ত্বে স্বয়ং ঈশ্বর যোগ নিদ্রায় শায়িত ছিলেন। (ব্রহ্মবৈত পুরানে উল্লেখ) তখন তাঁর নাভী পদ্ম থেকে ব্রহ্মা সৃষ্টি হলেন। তিনি চারিদিকে কাউকে না দেখে পদ্মনালে পাতাল গর্ভে প্রবেশ করেও কিছু দেখতে পেলেন না। তখন ঈশ্বর দৈববাণী করে বললেনÑ হে ব্রহ্মা আমি কাউকে দর্শন না দিয়ে কেউ আমাকে দর্শন করতে পারে না- তুমি যোগমায়ার ধ্যান কর তবেই আমাকে দর্শন করতে পারবে। [বিষ্ণুর কর্ণমূল থেকে মধু কৈটড জন্মগ্রহণ করে। এই দুই অসুরকে বিষ্ণু তাঁর যোগমায়ার যোগসাজসে হত্যা করেন। সেই মধুকৈটড দুই অসুরের মেদ থেকেই মেদেনীর (পৃথিবী) সৃষ্টি হয়।

একশত আটটি নীলপদ্ম দিয়ে শরৎকালে ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র তাঁর সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করতে যোগমায়া চন্ডীর আরাধনা করেন। যা কৃত্তিবাস রামায়নে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বাপর যুগে স্বয়ং যশোদা কাত্যায়নী ব্রত করে পুত্র রূপে শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করেন। শ্রী মদ্ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণ যোগমায়ার শক্তি প্রভাবে শিশুকালে পূর্তনাকে বধ করেন। ব্রহ্মা যখন গোপ বালক ও গো বৎস হরণ করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ যোগমায়াকে স্মরণ করে নিজের দেহ থেকে অনুরূপ গোপ বালক ও গোবংস সৃষ্টি করেন।

ব্রজগোপীরা কাত্যায়নী ব্রত করে শ্রীকৃষ্ণ কৃপা লাভ করে ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শক্তি সাধনায় শ্রী চন্ডীর আরাধনা করতে উপদেশ দান করেন। প্রথমে অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে এসে নিজেকে অহংকারী বীর মনে করে তার রথের সারথী শ্রী কৃষ্ণকে রথখানা উভয় সৈন্যের মাঝখানে রাখার আদেশ করেন। শ্রী কৃষ্ণ তার সখা অর্জুনের অহংকার চূর্ণ করার জন্য অর্জুনকে মহামায়ার মহাসাগরে নিক্ষেপ করেন। মহামায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে শেষে অশ্রুসজল অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে গুরু বলে সম্বোধন করে মঙ্গল কামনা করেন। শ্রী কৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, ‘আমার মায়া দ্বারা এ জগত আচ্ছাদিত’। তবে হা্যঁ যারা আমার স্মরণ গ্রহণ করে তাদের আমি মায়া থেকে মুক্ত করি।

এই মায়াময় সংসারে সবাই মায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত। শুধু মানুষ নয় পশু পাখি ও মায়া মমতায় মহামায়ার মায়ায় বন্দী। প্রত্যেকটা মানুষ- সত্ত্ব, রজঃ আর তমঃ- এই তিনটি গুণের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কার ভেতর কী গুণ কখন কীভাবে কাজ করছে তা তার আচরণ বা স্বভাব লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন। তাদেও খাদ্য খানা ও ভিন্নতর। স্বাঞ্চিক রাজসিক ও তামসিক।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেনÑ ‘ইউরোপের লোকেরা ইচ্ছামত জীবনকে ভোগ করে নেয় বলেই, সত্যিকারের ত্যাগ তারাই করতে পারে। তন্ত্রে ও এ কথার সমর্থন রয়েছে’, ‘ভোগেন মোক্ষসাধনম’ শক্তি না থাকলে জগতে ন্যায় ধর্ম কিছুই রাখা যায় না। তাই শক্তির সাধনা প্রয়োজন। জ্ঞান শক্তি, ধন শক্তি, আত্মার শক্তি সাধন চাই। তবে জগতের মঙ্গল সাধন সম্ভব। এদিকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভূ মহান ত্যাগের সহজ সরল পথ দেখিয়েছেন, ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরের মধ্যে মহামুক্তি বিরাজিত। চন্ডী পুরাণে উল্লিখিতÑ রুপং দেহি, য্যশা দেহি, ধনং দেহি, মোক্ষৎ দেহি, প্রার্থনা করা হয়েছে।

চন্ডি পুরাণে বর্ণিত: ভাগ্য বিড়ম্বিত রাজা সুরথ রাজ্যহারা হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এক সুন্দর তপোবন দেখতে পেলেন। মেধা মুণি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে আত্মজ্ঞানের শিক্ষা দান করছেন। সেই স্থানে সন্তান, প্রিয় স্ত্রী ও স্বজনদের দ্বারা বিতাড়িত বৈশ্য নামে এক দুঃখী এসে আশ্রয় নিয়েছেন। সুরথ আর বৈশ্য দুই দুখী শান্তিময় তপোবনে বেদ বাক্য শ্রবণ করে ও হৃদয়ে শান্তি পাচ্ছে না কেন? রাজ্যহারা রাজা সুরথ তার প্রজাবর্গের কথা ভেবে কষ্ট অনুভব করছেন। এ দিকে বৈশ্য তার প্রিয় সন্তান স্ত্রী, স্বজনদের কথা মনে করে অতীব কষ্টগুলোর দৃশ্য ভেবে অধীক কষ্ট অনুভব করছেন। এ বিষয়গুলো তারা দু’জনে মেধা মুণির চরণে নিবেদন করলেন। তারা বললেনÑ আমরা জানি এ সংসার অনিত্য। কেউ কারো নয়, ধন জণ সবই দুদিনের। তবুও কেন মন মানে না? মেধা মুণি বললেন আপনি মানুষ। আপনার জ্ঞান আছে। পশু পাখিরও জ্ঞান আছে। তবে এক এক জনের জ্ঞান এক এক রকম। পেঁচা দিনে দেখতে পায় না, রাতে কাক দেখতে পায় না। আর কেঁচো দিন রাত কখনও দেখতে পায় না। ইতর প্রাণীরাও তাদেও বাচ্চার মুখে আহার তুলে দেয়। এখানেও মহামায়ার প্রভাব লক্ষণীয়। এ মায়ার সংসার থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ কথা নয়। শ্রী রাম কৃষ্ণদেব দশ ইন্দ্রিয় ছয় রিপু, মোট ষোলকে জয় করেছিলেন। আর কলিরকুলুত্ব নাসিতে শ্রী গৌর সুন্দও জাতপাতে বর্ণপাদেও বেড়া ভেঙে হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ হরে রাম, হরে রাম, হরে রাম, হরে রাম।

যোগনামে জগত ভাঙিয়ে দিলেন। শ্রী বিষ্ণুর যোগ প্রভাবে যার সৃষ্টি যিনি সকল শক্তির আঁধারভ’ত সেই মহা শক্তি স্বরুশিনী দেবী সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কারিনী চ-িকা।

মহাভারতে ধৃতরাষ্ট্র জন্মঅন্ধ ছিলেন। তিনি পুত্র স্নেহে স্নেহান্ধ জ্ঞানান্ধ এমন কী ধর্মান্ধ ছিলেন এ সবাই মায়ার প্রভাব। মূলতঃ দেবী মহামায়াই জগৎকে ভুলিয়ে রেখেছেন, নিজের মায়ায় প্রাণীদের বেঁধে রেখেছেন এই মায়া মমতার বাঁধনে।

যিনি বিশ্ব সংসার সৃষ্টি করেছেন সেই বিশ্বময়ীর সাধনা করে সুরথ ও বৈশ্য সিদ্ধি লাভ করেন। এতে সুরথ করলেন মহামায়ার সাধনা আর বৈশ্য করলেন যোগমায়ার সাধনা। যোগমায়ার সাধনা করে বৈশ্য স্বয়ং ঈশ্বর পদে আত্ম নিবেদন করে পরম শান্তি লাভ কররেন। আর মহামায়ার সাধনা করে সুরথ মহামায়ার কৃপায় রাজ্য ফিরে পেলেন। মহালয়ায় মহাদেবীর শ্রী চরণে আত্মনিবেদন করে পিতৃমাতৃঋণ, গুরুঋণ দেবঋণ, দেশঋণ, ভূমিঋণ, পঞ্চঋণ মুক্ত হই। পূজার মিলনমেলায় সবার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধ হোক।

 

লেখক-
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
মুঠোফোন- ০১৭১১-৯৭৪৩৭২