এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ : শিল্প ও বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও। নগরী থেকে শিল্পাঞ্চল, মহাসড়ক থেকে নদীপথ— বিভিন্ন এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন বাস্তবতায় জেলার নতুন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ায় তার দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধের ধরন ও অপরাধীদের তৎপরতায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি আইন শৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিস্থিতি। নতুন এসপির কাছে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা সকল প্রকার অপরাধে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
নারায়ণগঞ্জে ছিনতাই শুধু গভীর রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, অলিগলি ও শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়েও ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। কর্মস্থল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, আলোস্বল্পতা, পর্যাপ্ত টহলের অভাব ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকাই ঝুঁকির অন্যতম কারণ।
সীমান্তবর্তী জেলা না হলেও নারায়ণগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথ ও রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। মাদককে ঘিরে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। নাগরিকদের দাবি, শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, সরবরাহের উৎস ও অর্থের যোগানদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিশোর গ্যাং নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ চলাফেরা, মারামারি, ছিনতাই ও মাদক সেবনের অভিযোগ ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অপরাধীদের আটক করা হলেও কিছুদিন পর একই এলাকায় নতুন করে অপরাধের অভিযোগ মেলে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিভিন্ন বাজার, পরিবহন স্ট্যান্ড, নির্মাণকাজ ও শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজির অভিযোগও ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের অন্যতম উদ্বেগ। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায় কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। নতুন এসপির জন্য এখানে বড় পরীক্ষা হবে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এছাড়া জেলার হাজারো শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপদ যাতায়াত, কারখানা ছুটির সময় যানজট ও ছিনতাই রোধ এবং শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ করাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন এসপির নেতৃত্বে পুলিশের কার্যক্রমে গতি ও দৃশ্যমানতা বাড়বে। কোনো অপরাধের পর দ্রুত মামলা নেওয়া, তদন্তের অগ্রগতি জানানো এবং ভুক্তভোগীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। থানায় গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ হয়রানি বা অবহেলার শিকার না হন—এটিও বড় প্রত্যাশা।
নাগরিকদের মতে, শুধু বড় ঘটনা ঘটলে অভিযান নয়, অপরাধ ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
সব মিলিয়ে নতুন এসপি মো. হাবিবুর রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। নারায়ণগঞ্জবাসী এখন দেখতে চায়—কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে কত দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়। আর সেই পরীক্ষার ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে পুরো জেলাবাসী।
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি