• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

চিনিগুঁড়া ধানে দুর্গাপ্রতিমা, খুলনায় নজর কাড়ছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৭:১৮ PM / ২৭
চিনিগুঁড়া ধানে দুর্গাপ্রতিমা, খুলনায় নজর কাড়ছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী খুলনায় শারদীয় দুর্গোৎসবে এবার নজর কেড়েছে এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। মাটির বদলে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের দানা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। অভিনব এই প্রতিমা দেখতে খুলনা নগরীর পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা।

খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে তৈরি করা হয়েছে এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা। ধানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানায় দেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তোলার কারুকাজ দেখতে প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়। অনেকের কাছেই ধানের দানায় তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম।

আয়োজকদের দাবি, খুলনা জেলায় ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির এমন আয়োজন এবারই প্রথম। প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান ব্যবহার করে চারজন ভাস্কর টানা দেড় মাস পরিশ্রম করে প্রতিমাটি নির্মাণ করেছেন।

সাধারণত মাটি, খড় ও রঙের মাধ্যমে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হলেও এবার সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ধানের দানাকে শিল্পের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন আয়োজকেরা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধানের দানা সাজিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দেবী দুর্গার অবয়ব ও প্রতিমার বিভিন্ন কারুকাজ।

ব্যতিক্রমী এই নির্মাণশৈলী এরই মধ্যে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছে। খুলনা নগরীর পাশাপাশি কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ ও বরিশালের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এসে প্রতিমাটি দেখছেন।

পাইকগাছা থেকে আসা দর্শনার্থী ইন্দ্রারানী সাহা রিতু বলেন, “চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়েছে—বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। প্রতিমার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বাংলার কৃষি ও ঐতিহ্যকে এভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”

সাতক্ষীরা থেকে আসা দর্শনার্থী শোভন দেবনাথ বলেন, “সাধারণত মাটি দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখা হয়। তবে ধানের দানায় তৈরি এমন প্রতিমা এবারই দেখলাম। প্রতিমার নির্মাণশৈলী ও সৃজনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এমন আয়োজন দুর্গোৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।”

মন্দির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি রনজিত কুমার রায় বলেন, ধান শুধু খাদ্য নয়; এটি বাংলার মানুষের জীবন, জীবিকা, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সেই সোনালি ধান দিয়ে দেবীর প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলার কৃষি ও সংস্কৃতিকে দেবী আরাধনার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “সোনালি ধানে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির প্রতীক নয়, এটি কৃষি, প্রকৃতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতিরও অনন্য প্রকাশ। ধান এ দেশের মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

রনজিত কুমার রায় আরও বলেন, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কৃষকসমাজের অবদানকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক মিলনেরও উপলক্ষ। “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—এই চেতনায় সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেন তাঁরা।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রতিবছরই নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ব্যতিক্রমী আয়োজনের ক্ষেত্রেও মন্দিরটির রয়েছে পুরোনো ঐতিহ্য।

মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে প্রতিমার সঙ্গে সিংহের গর্জনের শব্দ যুক্ত করে ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছিল। সে সময়ও বিষয়টি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

এবার চিনিগুঁড়া ধানের দানায় দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে আবারও নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছে মণ্ডপটি।

এদিকে শনিবার মহাসপ্তমী উপলক্ষে খুলনার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী নবপত্রিকা স্নান ও পূজামণ্ডপে স্থাপনের মধ্য দিয়ে দিনের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকা ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত।

কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদ গাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ—এই নয়টি উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। ফলে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে দেবী আরাধনার একটি গভীর যোগসূত্র প্রতিফলিত হয়।

মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ ও আরতির মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতি ভক্তি নিবেদন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সন্ধ্যায় ধূপ-প্রদীপ, ঘণ্টা, শঙ্খ ও ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলো।

এরই মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের দানায় নির্মিত দুর্গাপ্রতিমাটি এবারের শারদীয় উৎসবে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি কৃষি, প্রকৃতি, সৃজনশীলতা ও বাংলার ঐতিহ্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার এই আয়োজন দর্শনার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।