

মাসউদ আহমেদ : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অতিপ্রাকৃতি ছোট গল্প “জীবিত ও মৃত” এর বিখ্যাত উক্তি “কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই”। বিশ্বকবি শিহরণ জাগানো ছোট গল্পের বিখ্যাত এ উক্তিটি মৃত “কাদম্বিনী” জীবিত ফিরে আসাকে ঘিরে যা অত্যন্ত কাছের প্রিয়জনদের মধ্যেও ভীতি, আপদতুল্য, ভূত বা অশুভ অনুভূত করে সবাই তাকে এড়িয়ে চলেছে। অবশেষে অপমান,অনাদর,ক্ষোভে নিরুপায় “কাদম্বিনী” কে সর্বোচ্চ ত্যাগ তথা জীবন দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে সে জীবিতই ছিল।তারপরও সবাই বিশ্বাস করেছিল কিনা সে উত্তর পাওয়া যায় নি।
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ হতে বাংলাদেশ বিশ্ব মিডিয়ায় নানা অভিধায় ভূষিত হচ্ছে।তার আগে এবং সে দিন মধ্যরাত হতে বাংলাদেশের আলেম সমাজ, মাদরাসার ছাত্র ও অন্যান্য ইসলামী নেতৃবৃন্দের নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণের মরিয়া প্রচেষ্টা দেখলে কবিগুরুর উক্তিটি আরেকবার স্বরণ করিয়ে দেয়। সোসাল, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারিত হট নিউজ হচ্ছে “মন্দির পাহারা দিচ্ছে মাদরাসার ছাত্ররা” এমন নিউজ ৫ আগস্ট ২০২৪ এর আগে যে একেবারেই দেখা যায় নি তা কিন্তু নয় তবে এতটা অতিরঞ্জিত পর্যায় ছিল না।এ প্রসঙ্গে ৫ আগস্ট পরবর্তি কয়েকটি মেইনস্ট্রীম পত্রিকার শিরোনাম তুলে ধরা বেশ প্রাসঙ্গিক মনে করছি। ৬ আগস্ট ২৪ তারিখ দৈনিক যুগান্তর ছবি ছাপিয়ে শিরোনাম করেছিল ” সুনামগঞ্জের মন্দির পাহারা দিচ্ছে মাদরাসার ছাত্ররা”। ২২ জুন ২০১৯ তারিখ দৈনিক কালের কন্ঠ অনলাইন ছবি ছাপিয়ে প্রতিবেদন করেছিল শিরোনাম “মন্দির পাহারায় মুসলিমরা”। ২৫ আগস্ট ২৪ তারিখ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমস্ এর বিশ্লেষণ দেখিয়ে শিরোনাম করেছিল “ঢাকেশ্বরী মন্দির পাহারায় মুসলিমরা”। ৬ আগস্ট ২৪ তারিখ ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকার শিরোনাম “গাজীপুরে মন্দির পাহারায় মুসলিম যুবকেরা”। ১১ অক্টোবর ২৪ চট্রগ্রামে পূজার মঞ্চে ইসলামী গান নিয়ে বি.বি.সি সহ মূলধারার মিডিয়ায় ব্যাপক তোলপার ছিল। আবার ১১ অক্টোবর ২৪ রাতে ঝিনাইদহের কোটচাদপুরের বাজেবামনদাহ হরিতলা পালপাড়া পূজামন্ডুপে গীতা পাঠ করে উলু ধ্বনি উপহার পেলেন জামাতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান (কালবেলার প্রতিবেদন)। প্রতিটি খবর ভাইরাল ছিল সর্বজনজ্ঞাত ভাইরাল এ সংবাদ ছাড়াও আরো বহু নিউজ আছে যেখানে মুসলমানদের অসাম্প্রদায়িকতার আসল ও চিরসত্য চিরচেনা মননের প্রমাণ দেয়ার মরিয়া প্রচেষ্টার প্রমাণ মিলে।
মূল আলোচনায় ফিরে কিছু প্রশ্ন প্রচন্ডবেগে ধেয়ে আসে তা হচ্ছে, মুসলিমরা কি ঠিক পদক্ষেপে হাটছে? নাকি বৃহত্তর স্বার্থের খোড়া বুঝ বুঝিয়ে ইসলামের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ শিরক যা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না তা জাতির সামনে হালকাভাবে উপস্থাপন করছেন? বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) যখন শিরকের বিরুদ্ধে একত্ববাদের প্রচার করেছিলেন তখন পুরো পৃথিবী ছিল শিরকে ভরপুর বৃহত্তর স্বার্থে কোনদিন তিনি এমনটা করেছিলেন? ভিন্ন ধর্মালম্বীরা স্ব-সম্মানে তাদের ধর্ম পালন করবে অসাম্প্রদায়িকতা প্রমাণ করতে ইসলামের মৌলিক, চির- গৌররব গাথা, স্বকীয়তা, আত্মমর্যাদা, বিশ্বনবীর জীবনের মূল আদর্শকে ছোট করার যে আয়োজন চলেছে তা মুসলিম জাতি ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খুবই ভয়ংকর পদক্ষেপ । দেশের মোট জনসংখ্যার ১০% হিন্দু সম্প্রদায়ের মনতুষ্টি করতে ৯০% মুসলমানকে আঘাত করা হয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি ভারতীয় হিন্দুদের খুশি করতে ২০০ কোটি মুসলমানের স্বকীয়তা, মৌলিক আকিদা,ইসলামের সৌন্দর্য ও ইজ্জত বিকিয়ে দিচ্ছেন নিজের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে যা আপনাদের নতজানু বা দুর্বলতার প্রকাশ পেয়েছে। যুগ যুগ ধরে আলেম সমাজ মূর্তিপূজাকে ইসলামী আকিদা বিরোধী ,ইসলামের মৌলিকত্বের সাথে সাংঘর্ষিক, শরীয়ত গর্হিত,একত্ববাদ বিরুদ্ধ সর্বপরি আল্লাহর বিধান পরিপন্থী বলে পূজায় মুসলমানদের অংশগ্রহনে নিষেধ করে আসছেন আর আপনারা সেথায় উপস্থিত হয়ে কি প্রমাণ ও পরিচয় দিলেন?যে ফতুয়া দিয়ে সাধারন মুসলমানদের বারণ করছেন, এখন এসে আলেম ধর্মীয় পোশাকে সে পূজায় অংশগ্রহন করে সরল বিশ্বাসী মুসলিম মনে কচিমনা মুসলিম শিশুদের মনে সর্বপরি মুসলিম মনে ধোকা,ব্যাপক প্রশ্ন, ক্ষোভ দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। মুসলমানরা, সুন্নতি পোশাকে, মাদরাসার শিক্ষার্থীগণ মন্দির পাহারা দিবে কেন?এটা কি তাদের কাজ? তারা তো একত্ববাদ লালন করে, শিরক করবে না তা ঘৃণা করে তাদের এ কেমন সাংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা হচ্ছে? মদ খাওয়া হারাম, জেনা করা হারাম জেনে কোন মুসলিম তা নির্ধিধায় করার পাহারাদার হবে ইসলামী শরীয়ত এটা সমর্থন করে না। পূজাকমিটি তাদের পূজার নিরাপত্তা টিম বানাবে, সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে,বেসরকারি, ব্যক্তিগত, সিসি ক্যামেরা ইত্যাদি যেভাবে দরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধান তারা করবে। মুসলিমগণ তাদের ধর্মীয় কাজে কোন প্রকার বাধা দিবেনা বাস এতটুকুই যথেষ্ঠ নয় কি?ইসলাম এতটুকুই সমর্থন করে এর বেশি নয়। আপনাকে সাম্প্রদায়িক বলবে, অন্য কেউ মন্দির ভেঙ্গে আপনার উপর দোষ চড়াবে, বিশ্ব বিশেষ করে ভারত দূষবে সে ভয়ে আপনি শিরকের সহযোগি হচ্ছেন আল্লাহ এবং আখেরাতের ভয় একটুও করেছেন?
ভারতের বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে রাম মন্দির বানানো হয়েছে, আরো বহু জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে ভারতে এমন মসজিদ পাহারাদার হিন্দু দেখা গেছে?বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় কখনো প্রকৃত অর্থে কোন প্রতিবাদ জানিয়েছেন? ভারতে মুসলিম নির্যাতন নিত্যদিনের ঘটনা তার প্রতিবাদ বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় সে অর্থে করেছে? প্রতিবাদী সভা সমাবেশ, মানব বন্ধন, বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনে প্রতিবাদ, ইত্যাদি কোন কিছু চোখে পরেনি।প্রায়ই দেখা যেত কোন হিন্দু যুবক ইসলাম ও নবী মুহাম্মাদ (স) এর প্রতি কটুক্তি করে সারাদেশে অশান্তি সৃষ্টি করে তুলত তখনও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি বা সংগঠনকে ক্ষমা চাওয়া বা দু:খ প্রকাশ করতে দেখা গেছে?দেশে কিংবা বিদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতে বাংলাদেশের অমুসলিম ভাইরা সোসাল মিডিয়ায় সেভাবে প্রতিবাদ করেন?পল্লী কবির ভাষায় “আমার এ ঘর ভাঙ্গীয়েছে যেবা আমি বাধি তার ঘর” এটাই আবাহমান কাল হতে মুসলমানদের চরিত্র ছিল আর অন্যরা তার সুযোগ নিচ্ছে। পূজায় গীতা পাঠ,ইসলামি সংগীত গাওয়া,নির্ঘুম মন্দির পাহারা দেওয়া,মন্দিরের কমিটি পুরোহিতের সাথে মত বিনিময়ের হিরিক ইত্যাদি কাজ দেখে জনৈক ব্যক্তি বলছেন যে, ‘“মন্দির পাহারা দিচ্ছি তাতেও বিশ্বাস হচ্ছেনা আমি অসাম্প্রদায়িক, আমি মন্দির ভাঙ্গিনা, পূজায় যাচ্ছি, দেবীর সবরত পান করছি, গীতা পড়ছি, সাজানো মূর্তির সামনে হাত তুলে দোয়া করছি, তাতেও না?আর কি করলে বিশ্বাস করবে? তাহলে কি দুর্গা পূজা করে হলেও প্রমাণ দিবে আমরা অসাম্প্রদায়িক?তাই আর কি বাকি আছে? কেন এমন নির্লজ্জ নতজানু? ইসলাম আগে নাকি পাছে লোকে কি বলে সেটা আগে? কিসের স্বার্থ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে যারা ইসলামী আদর্শিক রাজনীতি করেন সে জনগোষ্ঠীকে আঘাত দিয়ে কাদের এবং কি চাচ্ছেন?
মনে রাখতে হবে ইসলামের অস্থিত্ব সর্বাগ্রে।এর ফলেই ১৯৪৭ সালে পকিস্তান তারপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ভারত বাংলাদেশকে ইউক্রেন বানিয়ে ফেলার ভীতি, সেকুলার মুসলিম জাহির করা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বিদেশীদের সমর্থন আদায়, হিন্দুদের ভোট, সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠীকে সুযোগ না দেওয়া যে উদ্দেশ্যেই ইসলামের অস্তিত্ব বিকিয়ে এসব বাড়াবাড়ি করছেন জানা উচিত পুরো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করেই বিশ্ব নবী আল্লাহর একত্ববাদ যখন প্রচার করেছেন তখন পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধে ছিল সঙ্গী ছিলেন একমাত্র আল্লাহ তিনিই তাকে বিজয়ী করেছেন।যে উদ্দেশ্যই ইসলামকে খাটো করছেন স্বরণ রাখা দরকার ইসলামো ফোবিয়া, জঙ্গী, জিাহাদী বই, আরো নানা ভীতি ছড়িয়ে কুরআন, ইসলামী পোশাক, দাড়ি, ইত্যাদিতে চলাফেরা, বহন করা, অনিরাপদ করে দিলের ভেতর ভয় ধরিয়েছে না জানি কোন তকমা দেয় সে জুজু যে মোড়কে হাজির হয়েছে তা হচ্ছে কোন অজুহাতে যেন বিজয় হাতছাড়া হতে না পারে।বিজয় তো আল্লাহ দিয়েছেন এ বিশ্বস হারিয়েছেন? কাকে খুশি করতে মরিয়া হয়েছেন?
বউ স্বেচ্ছায় সংসার করতে না চাইলে যে কোন অজুহাতে ঝগড়া বাধাতে পারে। মিলে মিশে মুসলমানগণ সব ধর্মের সঙ্গে বসবাস করার ইচ্ছা সর্বযুগেই কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করে আসছে। হিন্দু সহ অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের ততটা দেখা যায়?আমাদের পাশে তাদের কতটা পাই?আমাদের আঘাতে তাদের কতটা সমবেদনা পাই?আর কত আঘাত পাই?সম্প্রীতির জন্য উভয়ের আন্তরিকতার প্রয়োজন আর না হয় ঐ প্রেমিকার মত দশা হবে যাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বাড়িতে নিয়ে অপকর্মের অভিযোগ দিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিবে তার মত হবে।এমনটাই হয়ত হয়েছে চট্রগ্রামের পূজায় ইসলামী সংগীত গাওয়া ও দুজন আটক হওয়ার ঘটনা। মন্দির পাহারা দিতে গিয়ে মন্দির ভাঙ্গার অভিযোগে কেউ আটক শুনলে অন্তত আমি অবাক হবো না।যার ধর্ম সে পালন করবে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলেই হলো। পাহারাদার আপনি না সরকার,প্রশাসন এবং ঐ ধর্মের লোকজন। তারা কিভাবে করবে তাদের ব্যাপার। আপনি অতিসম্প্রীতি দেখাতে গিয়ে সব জাতির ঘৃণা পাচ্ছেন না তো?
লেখক – মাসউদ আহমেদ
শিক্ষক ও কলামিষ্ট
লালমোহন, ভোলা।
আপনার মতামত লিখুন :