

মাসউদ আহমেদ : ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের চেষ্টা? লাভ-ক্ষতির মূল্যায়ন’ শিরোনামের প্রবাদটির মর্মার্থ হচ্ছে নিজের বড়ক্ষতি করে হলেও অন্যের ক্ষতি করা। হয় নিজের বড় ক্ষতি হউক যাত্রা বন্ধ তো হলো!প্রশ্ন হচ্ছে এতে কার কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হলো? প্রবাদটি প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে ভোলার পৌর ১নং ওয়ার্ড সংলগ্ন শ্রী শ্রী দূর্গা মাতার মন্দীরের পূর্জা মণ্ডুপের গেইটে হামলা কালে জেলার বাপ্তা ইউনিয়ানের মৃত মধু চন্দ্রের দের ছেলে শিমুল চন্দ্র (৩৫) কে পুলিশ আটক করে। যদিও পরিবার বলছে শিমুল চন্দ্র মানসিক ভারসাম্যহীন। এ প্রসঙ্গে ৩০ আগস্ট ২০১৬ তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় টঙ্গিতে সঞ্চয় কুমার সাহা (২৮) নামের এক যুবককে মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙ্গচুর ও পুরোহিতকে মারধরের অভিযোগে আটক করেছিল পুলিশ। লক্ষনীয় বিষয় যে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি প্রতিবেদনে বলেছে যে, হামলার সময় যুবকটি “আল্লাহু আকবর” স্লোগান দিচ্ছিল এবং তার পরিচয় দিচ্ছিল মোবারক। ভোলার এবং টঙ্গীর দুটি ঘটনার হুবাহু মিল পাওয়া যায় একটি যায়গায় তা হচ্ছে,উভয় পরিবারের দাবি ছিল একই “ হামলাকারী যুবকদ্বয় মানসিক ভারসাম্যহীন”। ঘটনার বিশ্লেষণ করে বুঝা যায় আসলেই তারা মানসিক ভারসাম্যহীন নাকি পরিকল্পিত হামলা করে ধরা খেয়ে দায় এড়ানোর জন্য কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে? হামলার সময় “আল্লাহু আকবার” স্লোগান দেওয়া যা একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর স্লোগান যা নিয়ে ব্যাপক জুজুর প্রচারণা রয়েছে, নাম গোপন করে মুসলিম নামে পরিচয় দেওয়া ইত্যাদি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে আসলে তারা মানসিক ভারসাম্যহীন না কৌশল নিচ্ছে? নেত্রকোনায় মন্দিরে হামলার সময় নেপাল চন্দ্র ঘোষ(৩৫) নামের হিন্দু যুবক আটক হয়েছিল। উপরের ৩টি ঘটনার দৃষ্টান্ত পেশ করা হলেও, এমন ঘটনার বহু প্রমাণ আছে।
***
সনাতনী কোন হিন্দু মন্দিরে হামলা করতে পারে না এটা যেমন সত্য রাজনৈতিকভাবে ফায়দা হাসিলের উদ্দ্যেশ্যে একটি মহল সংখ্যালঘু নির্যাতনের গুটি চালাচ্ছে তাও সত্য। এ মহলটির কতিপয় যে হিন্দু ধর্মের না তা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।এখানে ভেতরের বাহিরের বহু অদৃশ্য হাতের ইঙ্গিত কলকাঠি নাড়ছে কিনা তা পরিস্কার হতে বাকি নেই।
***
বি.বি. সি. ডয়েসে ভেলে সহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পত্রিকার বিশ্লেষণে একটি বিষয় পরিস্কার হয়েছে যে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে বা মন্দিরে হামলা ধর্মীয় কারণে আর্থাৎ হিন্দু হওয়ার কারণে নয় বরং বেশির ভাগ রাজনৈতিক কারণে যা মুসলমানদের বাড়িতেও হয়েছে।যদিও যে কোন হামলাই অগ্রহণযোগ্য,বেআইনী।একটি কথা এখন ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে তা হলো “ রাজনীতি করে জুলুম করবে আর পাল্টা আঘাত আসলেই সংখ্যালঘু নির্যাতন” এমন প্রবনতা লক্ষ করা যাচ্ছে।আর অসংখ্য গুজব রটিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সম্প্রীতি নষ্টের যে ষড়যন্ত্র তা চলমান আছে। সংখ্যালঘু তত্ত্বের কবর রচিত হউক্ যারা এ দেশে জন্মেছে, সবাই এদেশের নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে।সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই।যে ভারত বাংলাদেশে এ সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর হামলা জুজু প্রচার করছে দেখা যাচ্ছে সে দেশেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর হামলা হচ্ছে। মুসলমানদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। গুজরাট, মুজাফফর নগর সহ বহু স্থানে এমন ঘটনা দেখা গেছে।এগুলো নিয়ে তাদের নীরবতা সংখ্যালঘু নিয়ে তাদের কথা বলার নৈতিক অধিকার যে নেই তার প্রমাণ।
***
এধরনের হামলার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কখনো হামলাকারী মটর সাইকেল দিয়ে পালিয়ে গেছে, কখনো গভীর রাতে, অগোচরে, কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় পালিত ব্যক্তিদের ধরা পড়তে দেখা গেছে।দুঃখজনক হলেও সত্য যে হামলা যে বা যারা যখন সেভাবেই করা হউক না কেন দোষের ইশারার আঙ্গুলী ইসলামী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিকেই তাক করা হয়েছে। দেশের কতিপয় অসাধু মিডিয়া বাছবিচার ছাড়াই তা প্রচার করছে।
যেন “যত দোষ নন্দ ঘোষ ” প্রবাদেরই বাস্তব দৃষ্টান্ত। অথচ যাদের দিকে দোষের ইশারা করা হয় তাদের কখনো এসব হামলায় জড়িত হওয়ার প্রমান দেখাতে পারেনি তারা বরাবর এগুলোকে ষড়যন্ত্র, প্রপাগান্ডা, আন্তর্জাতিকভাবে তাদের, ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে, বিশেষকরে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিত সৃষ্টি করে ফায়দা নেওয়ার চক্রান্তকারী মহলের অপপ্রচার বলে আসছে। তাদের প্রতি এসব মিথ্যা অভিযোগ তারা যতই অস্বীকার করে কিছু মিডিয়া তা নেতিবাচক ভাবে প্রচার করেই চলছে “যেন চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী “। এখন ১০ অক্টোবর ২৪ এর ভোলার ঘটনা , ৩০অক্টোবর ২৪ টঙ্গীর ঘটনা, এবং ১৮ আগস্ট ২৪ এর তিনটি ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের কি দেখাচ্ছে? এঘটনাগুলো কিসের ইঙ্গিত বহন করে?আরো ভয়ংকর কথা হচ্ছে এরকম ঘটনা আরো আছে। যারা সনাক্ত হয়নি তাদের মধ্যে যে আরো এমন পরিচয়ের নেই তার নিশ্চয়তা কে দিতে পারবে?
***
অন্যান্য ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা উপলব্ধি করতে পারছি যে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা বন্ধের চেষ্টাও চালু আছে, এগুলোে ঠেকাবে কে? কার উপর এ দোষ চাপাবে? বিশ্ব মিডিয়া বিশেষকরে ভারতীয় মিডিয়া এগুলো কি প্রচার করছে ? যারা হামলার পর পালিয়ে গেছে তাদের কে গ্রেপ্তার করতে পারলে এমন ভোলা টঙ্গীর মত পরিচয়ধারী যে হত না তার নিশ্চয়তা কি? কেন এগুলো করছে? এগুলো কি অসাম্প্রদায়িকতার পরিচায়ক? দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে এঘটন গুলো অত্যন্ত ভয়ংকর নয় কি? ঘরের ইঁদুরে বাধ কাটলে সে বাধ কে দিবে? ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় হিন্দু যুবক বিপ্লব চন্দ্র শুভ, বাসু দাশ নবী মোহাম্মাদ (স) এর প্রতি কটূক্তি করার জেরে কত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তা কি আমরা ভুলে গেছি? উল্টো মুসলমানদেরই জীবন দিতে হয়েছে!জেলে যেতে হয়েছে। কেন? তারপরও কেন এসব চলছে? আসলে এগুলোর উদ্দেশ্য কী? কার লাভে এগুলো করা হচ্ছে?কার কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে?ভোলায় কোন ইসলামিক ব্যক্তি এমন হামলা করেছে তা তো শুনিনি। একটু ভাবা উচিত।
***
এসব ঘটনা কোন সুফল বয়ে আনে নি আনছে না আনবেও না।ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক জীবনে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি সাধন করে।আবহমান কাল থেকে চলে আসা সকল ধর্মের সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধনে প্রচন্ডরকম কুঠারাঘাত। জিঘাংসা, হিংসা,শত্রুতা, বিদ্ধেষ,ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে এসব ঘটনা।গ্রামে ছোট্ট পরিসরে অসংখ্য ভিন্ন ধর্মের লোক বসবাস করে আসছে। প্রতিদিন পরস্পরের দেখা হচ্ছে,একই বাজারে বাজার করছে,একই পাড়ায় রাস্তায় চলছে, একই পার্কে আড্ডা দিচ্ছে,একই যানবাহনে চড়ছে, সেখানে সংঘাত ছড়ালে পরিনতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বহু ঘটনা হতে আমরা অনুমান করতে পারি। বিদেশি চক্রান্ত, দেশি ষড়যন্ত্র, সফল হচ্ছে আর আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।এসব কোন ধর্মের কোন উপকার করছে না বরং নিজের পায়ে নিজেরা কুঠারাঘাত করছে বলা যায়। আমাদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরী। আর না হলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।
লেখক – মাসউদ আহমেদ
অনার্স-মাস্টার্স
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইতিহাস বিভাগ
লালমোহন, ভোলা।
আপনার মতামত লিখুন :