• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ অপরাহ্ন

কুড়িগ্রামে শুষ্ক মৌসুমে বড় ধরনের খরার আশংকা!


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৩, ২০১৯, ৬:০৪ PM / ১০৫
কুড়িগ্রামে শুষ্ক মৌসুমে বড় ধরনের খরার আশংকা!

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামে শুষ্ক মৌসুমে বড় ধরনের খরার কবলে পড়ার আশংকা কৃষকের। ইতোমধ্যে আগাম খরার কবলে পড়তে হয়েছে চরাঞ্চলের কৃষকদের। মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছে চরাঞ্চলের কৃষক। তুলনামুলক বন্যা আর বৃষ্টিপাত না থাকাকে দায়ী করছে কৃষক। জলবায়ুর প্রভাবে দীর্ঘ মেয়াদী খরার কবলে পড়ার আশংকা বিশেষজ্ঞরা।

দেশের সর্ববৃহৎ নদ-নদীময় জেলা কুড়িগ্রাম। দেশের বৃহৎ নদ ব্রহ্মপুত্রসহ, তিস্তা, ধরলা,দুধকুমরসহ ১৬টি নদ-নদী রয়েছে। আর এসব নদ-নদীর ৩১৬কি.মি. দৈর্ঘ্য পথে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় চর-দ্বীপ জেগে উঠেছে। এসব চরাঞ্চলে প্রায় ৪/৫ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। কৃষির উপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকতে হয় এই জনপদের মানুষদের। শীত-বর্ষা, খরা এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে জীবন সংগ্রামে বাঁচতে হয় এখানকার কৃষকদের।

গত বছর উল্লেখ যোগ্য বন্যা আর বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে চরাঞ্চলের কৃষককে পড়তে হয়েছে আগাম খরার মুখে। মাটির রস শুকিয়ে যাওয়ায় আবাদকৃত ফসলের ফলন নিয়ে শংকিত চরের কৃষক। প্রচলন আছে যে, বন্যা মানেই অভিশাপ হলেও বাস্তবে জেলার জন্য বন্যা যেন আশির্বাদ। ফলে এবারের চরের আবাদের চিত্র অনেকটাই ভিন্নরূপ দেখা দিয়েছে। নদ-নদী গুলোর তলদেশ ভরাট আর পানি ধরে রাখার ক্ষমতা ক্রমেই কমে যাওয়ায় বড় ধরনের খরার মুখে পড়ার আংশকা জেলার কৃষকদের। জেলার মোট আবাদী জমি ১লাখ ৬১হাজার ৮৭৩ হেক্টরের মধ্যে চরাঞ্চল জমি রয়েছে ৫৫হাজার ৪০৮ হেক্টর। আবাদ হয় ৩৪ হাজার ৯০১ হেক্টর। চরাঞ্চলের কৃষকগণ প্রতিবছরই ধান, বাদাম, কাউন,সরিষা, চিনা, তিল, তিশি, মাসকালাই,তরমুজ, মিস্টিকুমড়া,আলু বাঙ্গিসহ হরেক রকম ফসল উৎপাদিত হয় চরাঞ্চলের জমিতে। এরমধ্যে সদরে ৫হাজার ৮২০ হেক্টর জমি, উলিপুরে ১২হাজার ৬১৮ হেক্টরের মধ্যে ৪হাজার ৬২০ হেক্টর, চিলমারীতে ১৬হাজার ২০১ হেক্টরের মধ্যে ৮হাজার ৩০৯ হেক্টর, রৌমারীতে ১হাজার ৫৭৫ হেক্টরের মধ্যে ৯৭০ হেক্টর, রাজিবপুরে ১১হাজার ৩০৩ হেক্টরের মধ্যে ৮হাজার ৯৭০হেক্টর, ভূরুঙ্গামারীতে ২হাজার ৫১৫ হেক্টরের মধ্যে ২হাজার ৩৫০ হেক্টর, নাগেশ^রীতে ৩হাজার ৪২৭ হেক্টরের মধ্যে ২হাজার ১১২ হেক্টর, ফুলবাড়ি ১হাজার ৩০হেক্টরের মধ্যে ৯৭০ হেক্টর, রাজারহাটে ৯১৯ হেক্টরের মধ্যে ৭৮০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।

সদর উপজেলার চর যাত্রাপুরের কৃষক আব্দুল লতিফ(৬০) চরের জমিতে ধান, বাদাম,মাসকালাই সহ তিন বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন। চলতি শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে শুকনা থাকায় খরচ বেশি পড়েছে। ফলন তেমন একটা হয়নি। একই এলাকার বক্কর(৬৫),সোবহান আলী(৫৫) জানান, এবারে যে তাপের অবস্থা তাতে চরাঞ্চলে আবাদ করা নিয়েই সংশয় রয়েছি। মাঘ মাসেই নদ-নদীর পানি কমে গেছে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ্য মাসের দিকে যে কি অবস্থা হবে নদ-নদী গুলোর তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। বিগত বছর গুলোতে বাদাম চাষে বিঘা প্রতি ৫/৬হাজার টাকা খরচ করে ফলন পেতাম ১২/১৪মণ পর্যন্ত। কিন্তু এবারও একই খরচ করে বাদাম পাওয়া যাচ্ছে ৭/৮ মণ। ধারদেনা করে অনেকেই চাষ করে এখন লোকসানের মুখ পড়তে হচ্ছে।

জেলা আবহাওয়া অফিসের আবহওয়া পরিদর্শক এএইচএম মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, চলতি শুষ্ক মৌসুমে জুন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাপমাত্রা এবার ৪০ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবার পূর্বাভাস দেন। তিনি আরো বলেন, তবে এ বছর কালবৈশাখী ঝড়ের সময় অধিক বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হবার আশংকা রয়েছে। গত বছরের মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ মাত্রা কুড়িগ্রামে রেকর্ড করা হয় ৩৯ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়াম্যান আব্দুর রহিম রিপন জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নটি দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত। এবছর নদ-নদীর পানি কমে যাওয়া মাটিতে রস নেই। ফলে সেচ দিয়ে আবাদ করতে গিয়ে গুণতে হচ্ছে কৃষককে বাড়তি খরচ। তাপমাত্রা বেশি থাকায় চরের ফলনও কমে এসেছে। ফলে ধার দেনা করে আবাদ করলেও লোকসানের মুখে পড়েছেন এখানকার কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান জানান, বন্যা আর বৃষ্টিপাত না থাকায় কৃষককে ফলন উৎপাদনে ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় কুড়িগ্রামের আবাদী জমিতে পানি ধরে রাখার ধারণ ক্ষমতা কম থাকাকেও খরার জন্য দায়ী বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ুর প্রভাবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নদ-নদীসহ জীববৈচিত্রে এর প্রভাব পড়ছে। জেলাকে বড় ধরনের খরার হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার ইতোমধ্যে নদ-নদী খনন কাজের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্প গুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে পানির সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন খরার কথা স্বীকার করে জানান, জেলার নদ-নদীতে পানি না থাকায় চরাঞ্চলের কৃষকসহ অনেক কৃষকই ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনাসহ চরাঞ্চলের কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি।

(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৬:০০পিএম/২৩/১/২০১৯ইং)