• ঢাকা
  • রবিবার, ২৬ মার্চ ২০২৩, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন

‘কন্যা সন্তানের মায়েদের তসলিমা নাসরিনের বই পড়া উচিত’


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৯, ২০২৩, ৯:০৬ PM / ৫৬
‘কন্যা সন্তানের মায়েদের তসলিমা নাসরিনের বই পড়া উচিত’

সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি : আমরা অনেকেই বুঝে, কেউবা না বুঝেই তসলিমা নাসরিন নামক দেশ থেকে বিতারিত সেই লেখিকাকে গালি দেই। যাদের যোগ্যতা নেই তার সামনে গিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, তারাও একটা গালি দেই দূর থেকে। কিন্তু কেনো? কি এমন লিখেন তিনি, যার জন্য তাঁকে এত গালিগালাজ শুনতে হয়, দেশে প্রবেশ করলেই হত্যার হুমকি পেতে হয়? কেন রদবদল হওয়া কোনো সরকারই তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয় না?

আমার লেখালেখি জীবনের শুরুতেই আমি তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। ২০০০ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা/ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাতাম। যেগুলো প্রকাশ হতো, তার কপি ডাকডোগে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিত প্রকাশকরা। এক পর্যায়ে ২০০৪ সালের দিকে যখন আমার একের পর এক লেখাগুলো আমার শহর নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় পত্রিকা অফিসে পাঠাতাম, তখন সামনাসামনি কমেন্ট করা হতো- ‘‘এ যে দেখছি দ্বিতীয় তসলিমা নাসরিন’’, তখন ধীরে ধীরে তাঁকে জানার চেষ্টা করতাম। কারণ, আমি লিখি জীবন থেকে, একান্ত নিজস্ব ও খুব কাছ থেকে দেখা ঘটনাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে। কখনও কখনও নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে গবেষনা করে একটি লেখা শেষ করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে আমার সময় লেগে যেত ৫ থেকে ৬ মাস। অর্থাৎ আমার একটি তথ্যবহুল লেখার পেছনে কর্মব্যস্ততা ও লেখাপড়ার পাশাপাশি সময় ব্যয় করতে হতো দীর্ঘ ৫/৬ মাস। তখন মোবাইল/ইন্টারনেটের যুগ ছিল না যে এক টিপেই সব জেনে ফেলা যেত। যাই হোক্, যার সাথে নিজের লেখাকে তুলনা করা হচ্ছে, তাঁকে জানার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি লাইব্রেরীতে ঘন্টার পর ঘন্টা দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতাম। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর জন্ম থেকে বেঁচে থাকা অবধি ঘরে-বাইরে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ছিল তাঁর লেখার মূল বিষয়বস্তু। মিলিয়ে দেখলাম- সেসময় আমিও তসলিমা নাসরিনের মত খোলাসা করে লিখতাম। আমাদের চোখে ধরা পরা সমস্যাগুলো ছিল একই। বাস্তব জীবনের সত্য ঘটনাগুলো লিখতে লিখতে প্রতিবাদী হতে গিয়ে তিনি সমাজ ও ধর্মীয় রীতিতে আঘাত হেনে এক পর্যায়ে দেশছাড়া হয়েছেন। যেটাকে আমিও তাঁর বাড়াবাড়িই বলি এখনও। যে বাড়াবাড়ির কারণে তসলিমা নাসরিনকে আমিও অপছন্দ করি। কেননা সব সত্য বলতে নেই। যে চূড়ান্ত বাড়াবাড়িটা তিঁনি ছাড়া তার সমসাময়িক অথবা পরবর্তী লেখকদের মধ্যে আমরা কেউই করিনি। কেননা সত্য বলতে গিয়ে সত্য লিখতে গিয়ে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি করে যদি আপনজনদের থেকে আজীবন দুরে সরে থাকতে হয়, নিজের মা-মাটি ও দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়, অমন সত্য ১০০% খোলাসা করে নাইবা লিখলাম। কিন্তু সমস্ত বেরিকেডের পরেও সত্য এটাই যে- তাঁর বাড়াবাড়ি রকমের লেখাগুলো ছাড়া তসলিমা নাসরিন নারীর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যেসব যন্ত্রণার কথাগুলো লিখেছেন তা কোনো গল্প-কিচ্ছা নয়। প্রতিটি নারীর জীবনেই ওসব ঘটে। আমাদের কন্যা সন্তানেরা, আমরা, আমাদের মায়েরা, তার মায়েরা……………….. প্রতিটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নারীর সাথে সেসব ঘটেই।

যাই হোক্, সেই কৈশোর বয়স থেকে যখন আমি আমার পরিচিত বা আশপাশের কোনো কন্যা সন্তানের মায়েদের (শিক্ষিত/অশিক্ষিত) নানাভাবে বুঝিয়ে বলার চেস্টা করি মেয়েদের দেখেশুনে রাখতে, বাইরে খেলতে ছেড়ে দিয়ে যেন নিজেরা কাজে ব্যস্ত না হয়ে পরে, তখন কেউ তুরি মেরে উড়িয়ে দেয় আমার পরামর্শগুলো। জানি, কেউ কেউ হয়ত মনে মনে পাগলও আখ্যা দেয় আমাকে। অথচ যা কিছুই মন্দ ঘটবে তাতে কিন্তু লসের ভাগটা তাদের ভাগ্যেই জুটবে। আজ এই কথাগুলো লিখলাম কারণ, মনটা ভীষণ খারাপ। বলা যায় ভেতর থেকে দুমরে মুচরে কাঁদছি আজ আমি। আমার এক প্রতিবেশী যে ১৯ বছরের মেয়েটা আমার কাছে আমার নিজের সন্তানের মত, যে আমার হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে ঘরের কাজে আমাকে সহযোগিতা করে, ওর ৩ বছরের মেয়েটা আজ সকাল থেকে প্রস্রাব করতে পারছে না। খানিকটা প্রস্রাব করার সময় ভীষণ জ্বালাপোড়ার সাথে ভেতর থেকে রক্ত আসাতে মেয়েটা ভয়ে মুষড়ে গেছে। কিছুক্ষণ আমার বাসায় এনে নানাভাবে চেস্টা করলাম প্রস্রাব করাতে। কিন্তু ও প্রস্রাবের নাম শুনতেই কান্না শুরু করে দেয়। খেলনা হাতে দিয়ে নানাভাবে জিজ্ঞেস করাতে একবার বলছে -‘…. ৭/৮ বছরের খালতো ভাই (নাম উল্লেখ করলাম না) কাঁঠি দিয়ে প্রস্রাবের জায়গায় গুতো দিয়েছে, আবার বলে অন্য আরেকটা ছেলে গুতো দিয়েছে। এরপর এক পর্যায়ে কান্না শুরু করে দেয়……… ওহ কি বিভৎস! দেখলাম- ভেতরে ছিলে গেছে ভীষণভাবে। এতটুকুন বাচ্চাটা কত কস্টই না পাচ্ছে। এখন ওর বাবা মাকে দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছি মেয়েটাকে। অথচ ওর মাকে গত ৮/৯ মাসে একাধিকবার বলেছি- মেয়েটাকে বাইরে খেলতে দিয়ে নিজে কাজে ব্যস্ত থেকোনা। কিন্তু ও আমার কথাগুলো তুরি মেরে উড়িয়ে দিত। অথচ এখন? আমি মনে করি- কন্যা সন্তানের মায়েদের প্রত্যেকের তসলিমা নাসরিনের বইগুলো পড়া উচিত। অন্তত মানসিক দিক থেকে স্বনির্ভর হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং শিশুকালে মেয়েদের জন্য বাবা ও মায়ের পেটের ভাই ছাড়া চাচাত, খালাত, মামাত, ফুপাত ভাই, অমুক ভাই, তমুক ভাই, প্রতিবেশী ভাই, কোনো ভাই ই ভাই হয় না। বয়সের সাথে সাথে নারী যখন নিজেকে নিজে রক্ষা করা শিখে যায়, তখন সেই নারীর শত শত ভাই বানাতে সমস্যা নেই। আর সেই সাথে মধ্যবিত্ত/নিম্নবিত্ত মায়েদের জন্য বলব- আপনার ছেলে সন্তানটি যখন ৫/৬ বছর ক্রস করবে, তখন তাকে আলাদা ঘর দেয়ার অভ্যাস করুন। নাহয় ছেলেকে নিয়েই ঘুমান, ছেলের বাবাকে আলাদা ঘরে দেন। আবেগের বশে অতিরিক্ত আদরের টানে এই বয়সি ছেলে সন্তানকে স্বামী-স্ত্রীর সাথে একই খাটে রেখে বাচ্চাগুলোকে নষ্ট করবেন না। আমার এই লেখা পড়ে হয়ত অনেক ছেলের মায়েরা আমার উপর ক্ষিপ্ত হতে পারেন, কিন্তু চোখ মেলে তাকান। চারদিকে কি ঘটছে, আপনার মেয়েবেলায় কি ঘটেছে, আপনার মায়ের মেয়েবেলায় কি ঘটেছিল, তার মায়ের মেয়েবেলায় কি ঘটেছে সেসব ভাবুন। এ দেশের ৪০ বা ৬০ বছরের পুরুষের দ্বারাও ২ বছরের শিশু কন্যা ধর্ষিত হওয়ার বহু প্রমান আছে, আবার ৭/৮ বছরের ছেলে শিশুর দ্বারা ৩ বছরের মেয়ে শিশু ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাও আছে। সব ঘটনা প্রকাশ পায় না লোকলজ্জার ভয়ে। কিন্তু যেটুকুই প্রকাশ হয়ে আসছে, সেসব ঘটনা নিয়ে প্রতি বছর ৪ ফর্মার অন্তত ২০ টা করে বই প্রকাশ করা যাবে। সুতরাং প্রতিটি মেয়ের মায়েরা জীবনে তসলিমা নাসরিনের বইগুলো একবার হলেও পড়ুন এবং নিজেদের জানুন। ছেলের মায়েরাও পড়ুন। সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করতে চাইলে নিজেদের জানাশোনার বাইরে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করুন এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে ইন্টারনেট কানেকশন সহ স্মার্টফোন দেয়া বন্ধ করুন। বাংলাদেশে যত শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে বেশিরভাগ শিশু ধর্ষণ পারিবারিক পরিবেশে পরিচিতদের মাধ্যমেই হয়। সবশেষ ২০২২ সালে সারা দেশে ৫৪২ জন শিশু-কিশোরী ধর্ষণ এবং ৮১ জন শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আর অপ্রকাশিত কতশত ঘটনা যে অন্তরালে রয়ে গেছে সে ধারনা আমাদের গণমাধ্যমকর্মীদের রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী