দুজনই দিল্লির। খেলার ধরনও একই। ঋষভ পন্তের ব্যাটিংয়ে অনেকেই খুঁজে পান বীরেন্দর শেবাগের ছাপ। গতকাল আইপিএলে যেন সেটিরই প্রমাণ আরেকবার রাখলেন পন্ত! মাত্র ৪৩ বলে করেছেন ৯৭ রান! তাতেই গুজরাট লায়নসের ২০৮ রানের পাহাড়ও ১৫ বল হাতে রেখে পেরিয়ে গেছে দিল্লি ডেয়ারডেভিলস!
২০৯ রানের লক্ষ্য পেরোনো, সেটিও ১৫ বল হাতে রেখে! কতটা অবিশ্বাস্য কাজ, সেটি বুঝতে পারবেন এই তথ্য থেকে—এর আগে ২০৯ বা তার বেশি তাড়া করে আইপিএলে জিতেছে মাত্র একটি দল। দিল্লি সেটি কাল করেছে, কিন্তু এতটাই সহজে যে, শেষ ছয় ওভারে বলের চেয়েও প্রয়োজনীয় রান ছিল কম (রানরেট ছিল ছয়ের নিচে)!
আর কতটা দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছেন পন্ত, সেটি বুঝতে পারবেন দুটি টুইট থেকে। শচীন টেন্ডুলকার লিখেছেন, ‘আমার দেখা আইপিএলের সেরা ইনিংসগুলোর একটি। আর এটি দশ মৌসুম হিসেব করেই বলছি।’ যাঁর সঙ্গে তুলনা, সেই শেবাগও মুগ্ধ হয়ে টুইট করেছেন, ‘একজন খেলোয়াড় যখন নিজের ওপর অদম্য বিশ্বাস নিয়ে খেলে, আর বল মারার মতো বিশেষ দক্ষতাও থাকে, সেটি দেখতেই ভালো লাগে। পন্তের কাছ থেকে বিশেষ ইনিংস দেখলাম আজ।’
খেলায় তো মুগ্ধ হয়েছেনই, তবে শেবাগ সম্ভবত আরও বেশি মুগ্ধ হতেন ম্যাচের পর ১৯ বছর বয়সী ভারতীয় ব্যাটসম্যানের কথা শুনে। ম্যাচে পন্তের পাশাপাশি দুর্দান্ত খেলেছেন দিল্লি ওপেনার সাঞ্জু স্যামসনও, ৩১ বলে করেন ৬১ রান। দুজনে মিলে দ্বিতীয় উইকেটে ৬৩ বলেই গড়েছেন ১৪৩ রানের জুটি। সেই স্যামসনই ম্যাচের পর জানালেন, কীভাবে একটা কথা দিয়েই ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং বদলে দিয়েছেন পন্ত। কী বলেছিলেন? অত ভেবে কাজ নেই, শুধু মারো!
ইনিংসের দ্বাদশ ওভারে ওভারে পরপর দুই বলে ছক্কা মেরেছিলেন স্যামসন। ভেবেছিলেন, এবার একটু নিরাপদ খেলা যাক, সিঙ্গেল নিলেই হলো। কিন্তু পন্ত নাকি কৌশলটাতে সম্মতি দেননি। ম্যাচের পর স্যামসনই বললেন, ‘একটা ওভারে দুটি ছক্কা মারার পর ভেবেছিলাম, এবার একটা সিঙ্গেল নেই। কিন্তু ও (পন্ত) আমার কাছে এসে বলল, ভাইয়া, বেশি ভেবো না, শুধু মারতে থাকো। আমার মনে হয়, ওটা আমাকে মেরে যেতে সাহায্য করেছে।’
পন্ত নিজে অবশ্য কথাটাকে কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। তৃতীয় ওভারের পঞ্চম বলে করুণ নায়ার আউট হওয়ার দুই বল পরই মেরেছেন ছক্কা, ওই ওভারে স্যামসনও অবশ্য একটা ছক্কা মেরেছিলেন। পরের ওভারে আবার পন্তের দুটি ছক্কা! একটা সময় তো পন্ত-স্যামসন মিলে টানা চার বলে চারটি ছক্কা মেরেছিলেন! সব মিলিয়ে ইনিংসে দুজনেই ছক্কা মারলেন ১৬টি, দিল্লির ইনিংসে ছক্কা ২০টি! দুই দল মিলিয়ে ছক্কা ৩১টি—যা আইপিএলে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ড!
কিন্তু স্যামসন-পন্তের ব্যাটিংয়ের কাছে হার মানল রায়না-কার্তিকের জুটি। আগে ব্যাট করে ১০ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল গুজরাট। সেখান থেকে যে ২০৮ রান করতে পেরেছে তারা, সেটি তৃতীয় উইকেটে সুরেশ রায়না ও দিনেশ কার্তিকের ১৩৩ রানের জুটির সৌজন্যেই। রায়না ৪৩ বলে করেছেন ৭৭, ছক্কা ৪টি, চার ৫টি। কার্তিকের ৬৫ রান এসেছে ৩৪ বলে, চার ৫টি, ছক্কা ৫টি! এই দুজনের ঝড়ে ১৪ ওভার শেষেই রান ছিল ৩ উইকেটে ১৫৮, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত ২০৮ রানের বেশি আর টেনে নিয়ে যেতে পারেনি গুজরাট।
হয়তো এখন আফসোসই করছে তারা। ২৪ রানে দিল্লির ওপেনার নায়ারকে ফিরিয়েও দিয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় উইকেটে পন্ত আর স্যামসন মিলে আর জিততে দিলেন কই গুজরাটকে। পন্তের ইনিংসটার কারণে শেষ পর্যন্ত আড়ালে চলে গেছেন। না হলে স্যামসনও কিন্তু আলাদা বাহবার যোগ্য। ১৯৭ স্ট্রাইক রেটের ইনিংসটায় ছক্কা মেরেছেন ৭টি, একটিও চার নয়! পন্ত তবু ৯ ছক্কার পাশাপাশি ৬টি চার মেরেছেন। দিল্লির ২১৪ রানের ১৫২ রানই এসেছে চার-ছক্কা থেকে। ‘ভেবে কাজ নেই, শুধু মারো’—দর্শনটা পন্ত ভালোই ছড়িয়ে দিয়েছেন দেখা যাচ্ছে!
আর এই ঝড়ে প্রথমে ব্যাট করে এত ভালো পুঁজি নিয়েও শেষ পর্যন্ত গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার হতাশাই সঙ্গী হলো গুজরাটের।
