কাকন রেজা : ‘প্রিন্ট মিডিয়ার সময়কাল আর বড়জোর দশ বছর’- এমনটি বলেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিইও মার্ক থমসন। বছর দুয়েক আগে একটি প্রবন্ধে আমি প্রিন্ট মিডিয়া সম্পর্কে এমন কথাই বলেছিলাম। ‘অনলাইন জার্নালিজম’ শিরোনামে প্রবন্ধটিতে ‘অনলাইন’ গণমাধ্যম যে অন্যসব গণমাধ্যমের জায়গা দখল করে নেবে এমন কথা বলায় অনেকের টিকা-টিপ্পনি শুনতে হয়েছে। কিন্তু এবার বলেছেন ‘নিউ ইয়র্ক টাইমসে’র সিইও মহোদয়, তার কথাটি নিশ্চয়ই ফেলে দেওয়ার নয়।
এখন হলো তাৎক্ষণিকতার জামানা। অনেকটা ইনস্ট্যান্ট কফির মতন, ঢালো আর খাও। কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়াতে এমন তাৎক্ষণিকতা যোগ করা অসম্ভব। আজকে সন্ধ্যার ঘটনা কালকে সকালে জানানো ছাড়া খবরের কাগজের আর কোনো অপশন খোলা নেই। আর এই তাৎক্ষণিকতার জন্যই টিভি চ্যানেলগুলো এগিয়ে গেছে। স্ক্রলে তারা দিয়ে দিচ্ছেন তাৎক্ষণিক সংবাদ। মূল খবরগুলোতে দিচ্ছে ভিডিওচিত্রসহ ঘটনার একটি মোটামুটি চিত্র। ফলে খবরের কাগজগুলোকে ‘হার্ড স্টোরি’ তথা তাৎক্ষণিক সংবাদে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। সফট স্টোরির ক্ষেত্রেও যে কাগজগুলো এগিয়ে তাও বলা যাবে না। টিভিতে রয়েছে ‘প্যাকেজ সংবাদ’, রয়েছে সরাসরি আলোচনার সুযোগ। সুতরাং এক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিকতায় পিছিয়ে পড়ছে প্রিন্ট মিডিয়া। আর এ কারণেই মার্ক থমসন বলছেন, দশ বছরের মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়ার যুগ শেষ হতে যাচ্ছে।
শুধু প্রিন্ট মিডিয়া নয়, সংবাদের ক্ষেত্রে টেলিভিশনগুলোও টিকে থাকতে পারবে না ‘অনলাইনে’র সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। টেলিভিশনের হয়তো তাৎক্ষণিকতা আছে, কিন্তু সেই তাৎক্ষণিকতার কমতিও আছে। খবরের কাগজে যেমন একটি বিষয়ে আদ্যোপান্ত সম্পর্কে জানানো সম্ভব, টেলিভিশনে সেই সুযোগটা অতভাবে নেই। খবরের কাগজের সমৃদ্ধ একটি জায়গা হলো সম্পাদকীয় পাতা। এই পাতাটি মতামত, বিশ্লেষণ ও গবেষণায় এতটাই লব্ধ যে, এ জায়গার উচ্চতা ছোঁয়ার যোগ্যতা এখনো অর্জন করেনি টেলিভিশন। এটাই খবরের কাগজের মূল বনেদিয়ানা। যার ফলে দুটো মাধ্যমই দু’জায়গায় এগিয়ে। তাৎক্ষণিকতায় টেলিভিশন, বনেদিয়ানায় খবরের কাগজ।
কিন্তু এ দুটি অবস্থানই একসাথে ধারণ করতে পারে অনলাইন মিডিয়া। এখানে যেমন লেখার সুযোগ রয়েছে, তেমনি দেখানোর সুযোগও রয়েছে। একাধারে প্রতিবেদন, প্রয়োজনে ভিডিও প্রতিবেদন, একইসাথে সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ সবকিছু প্রচার-প্রকাশের জায়গা হলো অনলাইন সংবাদমাধ্যম। এ মাধ্যমটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পাঠক-দর্শকদের সাথে তাৎক্ষণিক বা যেকোনো সময় যোগাযোগের সুবিধা। যে কোনো সময় পাঠক একটি লেখার সাথে যুক্ত হতে পারছেন, মত দিতে পারছেন সেই লেখাটি সম্পর্কে। লেখকের সাথে আলোচনার একটি জায়গা সৃষ্টি হচ্ছে পাঠকের এবং এতে লেখক ও পাঠক উভয়েই সমৃদ্ধ হচ্ছেন। টেলিভিশনে সরাসরি যোগ দেওয়ার নানা ফ্যাকড়া রয়েছে। কিন্তু অনলাইনে একটি ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোন থাকলেই হলো, সরাসরি যুক্ত হতে কোনো সমস্যা নেই।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিইও বলেছেন, অর্থনৈতিক দিকের কথা। একটি মাধ্যম টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন অর্থের। সেদিক থেকে গণমাধ্যমগুলো মূল পূঁজি হচ্ছে গণসম্পৃক্ততা। যত বেশি মানুষ কোনো মাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত হবে, তত বেশি তার চাহিদা বাড়বে এবং বিজ্ঞাপন বাড়বে। রবার্ট থমসন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমস অনলাইনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশি সাড়া পাচ্ছে, প্রিন্টের চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে আয়ও বেড়েছে। উন্নত বিশ্বে এখন অনলাইন মাধ্যমে বেশি আয় হচ্ছে, অর্থাৎ দর্শক আর পাঠক বেড়েছে অনলাইন মাধ্যমের। এটাই স্বাভাবিক, মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্ট ফোন, রয়েছে সহজপ্রাপ্য ইন্টারনেট সুবিধা। সুতরাং কে আর বাড়িতে গিয়ে টেলিভিশন দেখে, আর কে-ই বা খবরের কাগজ কিনে পড়তে যায়।
আমাদের দেশও এখন খুব বেশি পিছিয়ে নেই। যদিও আমাদের দেশে ইন্টারনেট নিয়ে অনেক দিকদারির বিষয় রয়েছে। সারাদেশে এখন পর্যন্ত টুজির স্পিডই নিশ্চিত করা যায়নি, তারমধ্যে চলছে থ্রিজি। শুরু হয়েছে ফোরজিও। বড় গলায় বলা হচ্ছে, ‘আমরা এখন ফোরজি যুগে প্রবেশ করেছি’। অবশ্য অনেকের ভাষায় এই ফোরজি হচ্ছে, ছাগলের মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়ার দ্রুততা আশা করার মতন। তা যাই হোক, আমাদের দেশেও হাতে হাতে স্মার্ট ফোন রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা অনেক দেশের চেয়েও স্মার্ট। সুতরাং ‘স্মার্ট’ আমাদের ক্ষেত্রেও প্রিন্ট মিডিয়ার সময় ফুরিয়ে এসেছে। পাইপলাইনে রয়েছে গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনও।
পুনশ্চ: ‘অনলাইন জার্নালিজম’ নিয়ে আমার লেখা প্রবন্ধটি ছিলো ইংরেজিতে। ওই একটাই লিখেছিলাম বিজাতীয় ভাষায়। পরে আর সাহস হয়নি। কেন হয়নি বলছি। প্রথমত মাধ্যমের অনেক মোড়লরা নাক সিটকে বলেছেন, ‘বেশি বোঝে। এই দেশে এটা খুব সহজে হবার নয়’। কারও অভিব্যক্তিতে, ‘হাতি-ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল’ অবস্থা আর কী। সুতরাং এরপরে যা লিখছি বাংলাতেই লিখছি, আর হাতি-ঘোড়াদের কানের কাছে ‘নমরূদখ্যাত মশা’র মতো প্যানপ্যান করে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যেই তারা বিরক্তিতে হাতপা ছুড়ছেন, হয়তো বলছেনও, ‘এত বড় যন্ত্রণায় পরা গেল’।
ফুটনোট: নমরূদ আর মশার বিষয়টি তো অজানা থাকার কথা নয়, কী বলেন?
[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৯:৪০পিএম/৬/৩/২০১৮ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি