ঢাকারনিউজ২৪.কম, ডেস্ক : অনেকের কাছেই ঘটনাটা আশ্চর্যের। হিজড়া হওয়ার পরও সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল। কীভাবে সম্ভব? ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে বিষয়টি মোটামুটি সয়ে গেছে। কিন্তু তিনি এ একটি পদ আকড়ে থাকার মানুষ তো নন। পশ্চিমবঙ্গে রূপন্তরকামীদের অধিকার নিয়েই তার যত সব চিন্তা। বলছিলাম, মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা।
এবার এই মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই উঠেছে গুরুতর এক অভিযোগ। তিনি নাকি এক কিশোরকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হিজড়া বানানোর চেষ্টা করেছেন।
মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের প্রথম রূপান্তরী নারী, যিনি কোনো সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ট্রান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডেরও ভাইস-চেয়ারপারসন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, এক কিশোরকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হিজড়া সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে গ্রামে গ্রামে তাদের দলের সঙ্গে ঘুরতে বাধ্য করা হচ্ছিল। ওই কিশোর এই কাজ নয় বরং পড়াশোনা করতে চায়। পরে দলেরই এক সদস্যের সহযোগিতা নিয়ে পালিয়ে একটি সংস্থার কাছে যায় কিশোরটি। যেখান থেকে পাঁচ দিন পরে তাকে ফেরত পেয়েছে পরিবার।
ছেলের কাছ থেকে ঘটনা জানার পর পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে কমিশনের অন্যতম সদস্য প্রসূন ভৌমিক বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। বিষয়টা আমাদের চেয়ারপারসন অনন্যা চক্রবর্তী দেখছেন।’
অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মোবাইলে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি কথা বলেন, তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে তিনি রাজি হননি।
কিশোরের পরিবারের অভিযোগ
মুর্শিদাবাদের ওই কিশোর দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলে তার পরীক্ষা চলছিল। ১৯ নভেম্বর পরীক্ষার পরে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তার মা জানতে পারেন যে, সে আগেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে চলে গেছে। তখন তার বাবা-মায়ের সন্দেহ হয়, ছেলে অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই গেছে।
এ সন্দেহ কেন জানতে চাইলে কিশোরের মা বলেন, ‘এর আগেও ৫ সেপ্টেম্বর আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে। তাই দ্বিতীয়বারও আমাদের সন্দেহ হয় যে, নিশ্চয়ই ওখানেই আবার নেওয়া হয়েছে ছেলেকে। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ বলে, যেহেতু নির্দিষ্টভাবে জানা নেই যে ছেলে কোথায়, তাই কে বা কারা অপহরণ করেছে, সেটাই অভিযোগে লিখেছিলাম।’
কিশোরের পরিবার জানায়, ১৯ নভেম্বর রাতেই তারা নদীয়ার কৃষ্ণনগর উইমেনস কলেজে, যেখানকার প্রিন্সিপাল মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, সেখানে গিয়ে দেখা করেন মিসেস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন যে, ওদের ছেলে কোথায় সেটা ওর জানা নেই।
কিশোরের মা সে সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘অনেক কান্নাকাটি করার পরে মানবী ম্যাডাম শুধু বলেন, ছেলে হারিয়ে গেছে তো আমি কী করব। কলকাতার পি জি হাসপাতালে খোঁজ করুন। তারপরে আমরা কৃষ্ণনগর থানাতেও গিয়েছিলাম। আমাদের কাছে তখন ছেলেকে খোঁজার আর ফিরে পাওয়ার তাগিদটা বেশি ছিল।’
‘পাঁচ দিন পরে একটা ফোন আসে। জানতে পারি রূপান্তরকামী তিস্তা দাসের একটি সংস্থাতে রয়েছে আমার ছেলে। সেখান থেকে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনি। পরে তার কাছে জানতে পারি এ পাঁচদিন তার সঙ্গে কী হয়েছিল।’
ওই কিশোরের মা আরও বলেন, ‘ছেলে ফিরে আসার পরে তার কাছ থেকে জানতে পারি যে অঞ্জলি নামের এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির কাছে তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাকে ছেঁড়া-ফাটা নাইটি পরিয়ে গ্রামে গ্রামে হিজড়াদের দলের সঙ্গে ঘুরতে বলা হয়েছিল। আমার ছেলে প্রতিবাদ জানায়, বলে সে পড়াশোনা করতে চায়, ওই কাজ সে কেন করবে। ওই দলেরই অন্য একজনের সাহায্যে সে একটি সংস্থার কাছে পৌঁছায়, যেটি চালান এক রূপান্তরকামী। তারাই আমাদের খবর দেয়।’
‘আমার ছেলে কখনই রূপান্তরকামী নয়। সে পুরুষ হয়েই জন্মিয়েছে, সেইভাবেই বড় হতে চায়। তার স্বপ্ন আছে বড় হবে, পাঁচ জনের এক জন হয়ে উঠবে। মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওর ফেসবুকে পরিচয়। তারপরে ফোনেও কথা বলত, যেটা আমরা পরে জানতে পারি। আমার ধারণা কোনোভাবে ছেলের ব্রেনওয়াশ করা হয়েছিল।’
এই ঘটনায় রূপান্তরকামীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ট্র্যান্সজেন্ডার বোর্ডের আরেক সদস্য এবং রূপান্তরকামীদের নিয়ে একটি সংগঠন প্রধান রঞ্জিতা সিনহা বলেন, ‘অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এটা তো রীতিমতো পাচারের অভিযোগ। এ ছাড়া প্রতারণাও করা হয়েছে ওই কিশোরের সঙ্গে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।’সূত্র: বিবিসি বাংলা
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/কেএস/১:০৮পিএম/২৯/১১/২০১৮ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি