ফজলে রাব্বি, বাগাতিপাড়া (নাটোর) : প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আধুনিক বিনোদনের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম শিল্প ‘যাত্রাপালা’। এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় বকুল স্মৃতি থিয়েটারের উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয়েছে সামাজিক যাত্রাপালা ‘গৌরি মালা’।
শনিবার (৮ নভেম্বর) রাতে উপজেলার গালিমপুর গ্রামের গিরিশ ধাম জমিদারবাড়ি সংলগ্ন মাঠে আয়োজিত এই সামাজিক যাত্রাপালাকে ঘিরে গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন হওয়ায় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই মেতে ওঠেন গ্রামীণ বিনোদনের প্রাণবন্ত এই উৎসবে।
যাত্রাপালা ‘গৌরি মালা’-তে গ্রামীণ কুসংস্কার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সমাজে নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো নাট্যরূপে উপস্থাপন করা হয়। অভিনয় শিল্পীদের প্রাণবন্ত পারফরম্যান্সে দর্শকরা পুরো সময় মুগ্ধ হয়ে থাকেন। গ্রামের নারী, পুরুষ ও শিশুরা আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন এই সামাজিক নাট্যরূপ।
আধুনিক মঞ্চসজ্জা, আলো ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহারে পরিবেশিত হলেও উপস্থাপনায় ছিল সেই পুরোনো দিনের রূপ। ঢোলের তালে তালে সংলাপ, গান ও অভিনয়ের মেলবন্ধনে দর্শকরা ফিরে যান গ্রামীণ সংস্কৃতির অতীতে।
সারাদিন কৃষিকাজ শেষে সন্ধ্যায় উপজেলার জিগরী গ্রাম থেকে যাত্রা দেখতে আসেন কৃষক আব্দুর রাজ্জাক (৫২)। তিনি বলেন, “আজকাল এমন আয়োজন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেকদিন পর এত সুন্দর আয়োজন দেখলাম। মা-বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে উপভোগ করছি। কোনো অশ্লীলতা ছাড়াই এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ।”
লক্ষনহাটি গ্রামের গৃহিণী রোকেয়া বেগম (২৩) বলেন, “গ্রামে এখন আর এমন যাত্রা হয় না। আজ খবর পেয়ে পরিবারের সবাই মিলে দেখতে এসেছি। অনেকদিন পর এমন আয়োজন দেখে খুব ভালো লাগছে।”
যাত্রাপালার আয়োজন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী ও কলাকুশলীদের জীবিকা। একসময় যাত্রাই ছিল তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। এখন নিয়মিত মঞ্চায়নের অভাবে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা এখনো শিল্পটিকে ধরে রেখেছেন, তাদের দিন কাটছে হতাশায়।
অভিনয়ে যুক্ত একাধিক শিল্পী জানান, আগে নিয়মিত যাত্রার আয়োজন হলেও এখন নানা কারণে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি বিলুপ্তপ্রায়। ফলে, যাত্রার সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ শিল্পীই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। তবে যারা এখনও টিকে আছেন, তারা চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। শিল্পীদের দাবি, গ্রামীণ এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানান, ডিজিটাল যুগের বিনোদনের ভিড়ে মানুষ এখন যাত্রা, পালাগান কিংবা পল্লিগীতির মতো শিল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ এই শিল্পই একসময় ছিল গ্রামীণ সমাজের প্রধান সামাজিক ও শিক্ষামূলক মাধ্যম।
এই অনবদ্য আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মলয় কুমার রায় বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম ধীরে ধীরে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই এলাকার মানুষকে নির্মল ও নির্দোষ বিনোদনের সুযোগ দিতে এবং বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়কে ধরে রাখতেই আমরা এই যাত্রাপালার আয়োজন করেছি। যাত্রা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের নৈতিকতা, মানবিকতা ও পারিবারিক বন্ধনের বার্তা বহন করে। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হোক।”
বকুল স্মৃতি থিয়েটারের সভাপতি মাহবুব হোসেন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য গ্রামীণ সংস্কৃতির শেকড়কে ধরে রাখা। যাত্রাপালায় যে অশ্লীলতা ঢুকে পড়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের এই প্রয়াস। যাত্রাপালা একটি সুস্থ গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শিল্প। অশ্লীলতা পরিহার করে আমরা সেটিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছি, যাতে মানুষ আবারও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিয়মিত এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করা গেলে গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ধারাটি আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি