সীমান্ত শাহরিয়ার : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের সংঘাতের সময় ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। হঠাৎ করে গুলি এসে জীবন কেড়ে নেবে, এমনটা হয়তো তিনি কখনোই ভাবেননি। তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল কি না সেটিএখনো পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় মফস্বলে সাংবাদিকদের টার্গেট করে হত্যা এবং নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ফেনীর টিপু সুলতানের কথা অনেকেরই হয়তো এখনো মনে আছে। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে যে ভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল সেটি বেশ বিরল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের এমপি জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে ছিল মূল অভিযোগ। তার পর থেকে ফেনীতে আর সাংবাদিকতা করা হয়নি টিপু সুলতানের।
মফস্বলে সাংবাদিকতা ঢাকার তুলনায় অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ। মফস্বলের প্রত্যেকটা সাংবাদিক পরিচিত মুখ। সবাই সবাইকে চেনেন। সেখানে কোন সংবাদ হলে তাকে টার্গেট করা সহজ হয়। ঢাকায় সেটা কখনোই সম্ভব না। মফস্বলের সাংবাদিকরা প্রতিটি মুহুর্তে, প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চল আছে যেখানে সাংবাদিকতা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঝুঁকি তৈরি হয় নানা দিক থেকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অন্যতম। চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, সরকারি প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সময় মফস্বল সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে। পাশাপাশি মফস্বলে একজন সাংবাদিক তার পেশাগত কারণে যখন কোন প্রতিকূলতার মাঝে পড়ে তখন তার নিয়োগকারী সংবাদমাধ্যম তাকে সহায়তার জন্য কতটা এগিয়ে আসে সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।
যশোরের সাংবাদিক সাজেদ রহমানের বড় ভাই শামসুর রহমানকে ১৭ বছর আগে তার অফিসে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিছু বড় পত্রিকা বা মিডিয়া আছে যারা সাংবাদিকরা সমস্যায় পড়লে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দেখে। মামলায় পড়লে কর্তৃপক্ষ সেটা দেখে এবং সহযোগিতা করে। কিন্তু অধিকাংশ পত্রিকা বা মিডিয়া সাংবাদিকদের কোন সহযোগিতাই করে না। জেলা পর্যায়ে যে সব সাংবাদিকরা কাজ করছেন, তাদের অনেকেরই প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে কোন নিয়োগ পত্র নেই। এমনকি অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমের জেলা প্রতিনিধিদের কোনও মাসিক বেতন দেয়া হয় না। অনেক জায়গায় রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মাঝেও রয়েছে তীব্র বিভেদ ও মত বিরোধ।
বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকরা অনেকেই এ সব কারণে সাংবাদিকতার বাইরেও অন্য ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। ফলে তার কাজের ঝুঁকিও বাড়ছে। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন ইউনিয়নগুলোও রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিভক্ত। এই যদি পরিস্থিতি হয় তাহলে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো অধিকার রক্ষায় কতটা কাজ করতে পারছে ?
অনেক মফস্বল সাংবাদিকরা মনে করেন নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো সব সময় হয়তবা নির্যাতিত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতনের নিশ্চয়তা না থাকলেও খবর পাঠানোর চাপ ঠিকই থাকছে মফস্বল সাংবাদিকদের উপর। ফলে খবরের পেছনে যখন সাংবাদিকরা ছুটছেন তখন অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার দিকে নজর দেবার সুযোগ তাদের থাকে না। ওই সকল পরিস্থিতি মোকাবেলার কোন প্রশিক্ষণও নেই সাংবাদিকদের।
যে সব জায়গায় বা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা সহিংসতা কিংবা অন্য কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন, সে সব জায়গায় সাংবাদিকদের নিজস্ব কিছু প্রস্তুতি থাকা উচিত। আমাদের একজন মফস্বল সাংবাদিক হয়তো লেখার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, কিন্তু পরিস্থিতি কী ভাবে মোকাবেলা করতে হবে এবং কী ভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে, সে প্রশিক্ষণ তার নেই বা থাকেও না। গত এক দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অনলাইনের সংখ্যা ব্যাপক ভাবে বাড়লেও মফস্বল সাংবাদিকদের স্বার্থ উপেক্ষিতই বরাবর রয়েই গেছে। শীঘ্রই পরিস্থিতির একটি পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে আগামীতে হয়তবা কোন মিডিয়াতে কাজ করবে না মফস্বল সাংবাদিকরা।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম৭:০০পিএম/১১/২/২০১৭ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি