জুবায়ের আল মাহমুদ : স্বাধীন বাংলাদেশ ৪৬ বছরে পা দিয়েছে । এ ৪৬ বছরে রাস্ট্র মোটামুটি পরিপক্ক বলতে পারি । ৪৬ বছরে রাস্ট্র কতটুকু অর্জন করেছে তা আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান । একটি রাষ্ট্রের জীবনে ৪৬ বছর খুব একটা বেশি সময় নয় । স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল একেবারেই লণ্ডভণ্ড। এমন অবস্থায় শাসনভার গ্রহণ করেই বঙ্গবন্ধু একটি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রানপনে চেষ্টা করেন । তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে খুব শিগগিরই একটি দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় দেশে এখন একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল খুবই নাজুক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে খুব দ্রুত পুলিশবাহিনী, বিডিআর এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘ ৪৫ বছর বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনী অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) দেশের সীমান্ত রক্ষা এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনী তাদের দায়িত্বের পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তি মিশনের সদস্য হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষার কাজে নিয়োজিত থেকে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে।
বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সোভিয়েত নৌবাহিনীর সাহায্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর মাইনমুক্ত এবং সক্রিয় হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর এখন সারাবিশ্বে গ্রহণযোগ্য। বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিমানের যাত্রা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক রুট ছাড়াও অভ্যন্তরীণ রুটেও সরকারি-বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো বর্তমানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।। ১৯৭৪ সালের মধ্যে ঢাকা-আরিচা সড়কে তিনটি সেতুসহ ৫৬৭টি সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হয়। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু, মেঘনা সেতু, কালীগঙ্গা সেতুসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বহু সেতু নির্মিত হওয়ায় দেশে যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত আমাদের উন্নতিতে নতুন ল্যান্ডমার্ক । বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে। মাত্র ৭ হাজার মার্কিন ডলার রপ্তানি হয়েছিল সে বছর।২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বমোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯,০৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে তা ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১,৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ ৯,৬৫৩.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রপ্তানি আয় বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও দিনকে দিন বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ এর উপর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। যেগুলো থেকে প্রচুর পরিমানে পোশাক উৎপন্ন করা হচ্ছে। ৯০ দশকের পর নারীদের অন্তর্ভুক্তি এই শিল্পকে আরো গতিশীল করে তোলে।এই নারী শ্রমিকদের ঘামেই আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল । ২০১৩ সালে জিএসপি সুবিধা বাতিল হওয়ায় আমাদের গার্মেন্টস শিল্প মার্কিন বাজারে খুব বেশি সুবিধা করতে পারছে না । বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি বড় অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ হতে। পরিবর্তিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নানা অর্থনৈতিক সূচকে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবস্থান পিছনের সারিতে, তবে বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৫ সালের দেশভিত্তিক আলোচনায় এদেশের শিক্ষা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য সামাজিক খাতে উন্নয়নের প্রশংসা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে দেখা যায় দেশে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ছয় ভাগেরও বেশি। অর্থনীতির প্রত্যেক সূচক বাংলাদেশ এখন লাফিয়ে লাফিয়ে অতিক্রম করছে। পোশাক, মাছ, মাংস, জুতো, আলু বিভিন্ন উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। গত ৪৫ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। জমির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ২০ ভাগ। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার কারণে অভুক্ত বাঙালি নেই প্রায়।
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে সাবমেরিন। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের মধ্যে এর আগে মাত্র ৪০টি দেশের সাবমেরিন ছিল । বর্তমানে এই তালিকায় ৪১ নম্বর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হল ।দীর্ঘ নয় নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর এক সংগ্রাম শেষ হয়েছে, তারপরই শুরু হয়েছে দেশ গড়ার নতুন সংগ্রাম। এ সংগ্রাম উন্নয়নের, সক্ষমতা অর্জনের। এই অর্জনের পথে সাবমেরিন একটি বড় পদক্ষেপ।সাবমেরিন কেনা হতে না হতেই কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব বদলে গেছে। ভারতের বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। যে ভারত ছিল ১৯৭১ থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ।
অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের জন্য সাবমেরিন নিছক বিলাসিতা। কিন্তু বাস্তবতাটা হলো, গত একদশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশে নাটকীয় সাফল্য পেয়েছে। গতবছর বিশ্বব্যাংক প্রধান বাংলাদেশে এসে এ সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। এই সাফল্যের পরও বাংলাদেশের ২২ ভাগ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দারিদ্র্য বিমোচনের ধারায় নিশ্চয়ই এ অবস্থারও উন্নতি হবে। । সক্ষমতা বাড়ানো দারিদ্র্য বিমোচন ধারাকেই শক্তিশালী করবে। যে টাকা দিয়ে আমরা সাবমেরিন কিনেছি, সে টাকা দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন করা যেতো। ব্যাংকিং খাতে লুটপাট বন্ধ করা গেলে চোখ বন্ধ করে এমন আরো কয়েকটি সাবমেরিন কিনে ফেলা যেতো। সাবমেরিন কেনার পাশাপাশি, আমাদের সবক্ষেত্রে, বিশেষ করে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আদালত ঘোষিত মামলার রায়ে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে ১লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা এবং ভারতের কাছ থেকে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর অধিকার অর্জন করেছে। সমূদ্রে পড়ে থাকা আরেক বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে সঠিক উপায়ে । বাংলাদেশ জনবহুল গরিব দেশ । তাই আমাদের জলে-স্থলে প্রতিটি ইঞ্চি সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। সমুদ্রসীমা জয়ের পর ব্লু ইকোনমি উঠে এসেছে আলচনায় । ব্লু ইকোনমির সুবিধা আদায় করতে সমুদ্রে আমাদের কর্তৃত্বটা নিশ্চিত করতে হবে। দুটি সাবমেরিন নিশ্চয়ই বিশাল সমুদ্রে আমাদের অবস্থান শক্ত করবে। আমাদের নৌবাহিনীর মনোবলকে বাড়াবে ।
জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, কৃষির উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশসহ সকল ক্ষেত্রেই গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে। স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, খেলাধুলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে ৬০শতাংশই তরুণ । মোটকথা দেশ এখন তারুন্যে ভরপুর । চারদিকে তারুন্যের জয়জাত্রা । সেই তারুন্যের জয়জাত্রায় সারথি হোক আমাদের তারুণ্যে ভরা সবুজ বাংলাদেশ । একদিন এই বাংলাদেশই হবে উচ্চ আয়ের কোন দেশ , তারুন্যের এ বিশাল শক্তি আমাদের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর ।
লেখক : জুবায়ের আল মাহমুদ
(কবি, শিক্ষার্থী MBA- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় )
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/৬:৩৭পিএম/২/৪/২০১৭ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি