ঢাকারনিউজ২৪.কম, ডেস্ক : উৎক্ষেপণের সাত বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর পেছনে ব্যয়কৃত অর্থ উঠানোর স্বপ্ন দেখছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, এই অর্থ তুলে আনতে বিপণনে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। এই কাজটি করতে হবে স্যাটেলাইট দেখভালের জন্য সরকারের নবনির্মিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডকে (বিসিএসবি)।
২০১৫ সালের মার্চে স্যাটেলাইট প্রকল্পের জন্য একনেক ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে সরকারের ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ এবং বিদেশি অর্থায়ন ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি শেষ হতে খরচ হয় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা এবং বাকি ২০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা অর্থ সাশ্রয় হয় সরকারের। তবে বিনিয়োগকৃত অর্থ ৭ বছরের মধ্যেই উঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
যেভাবে উঠে আসবে খরচ
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর মধ্যে ২৬টি কেইউ-ব্যান্ড ও ১৪টি সি-ব্যান্ডের। ওই ট্রান্সপন্ডারগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অন্যগুলো বিভিন্ন দেশের কাছে ভাড়া দেওয়া হবে। এ থেকে অর্থের সিংহভাগ উঠে আসবে।
গাজীপুরের জয়দেবপুরে নবনির্মিত গ্রাউন্ড স্টেশন । ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন সময়ে দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘেঁটে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বছরে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় করে। নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর বাইরের কারো কাছ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিতে হবে না দেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে। ফলে দেশের অর্থ দেশেই থেকে যাবে। এই হিসাব অনুযায়ী আগামী ৭ বছরে দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর কাছ থেকে মোট অর্থ আসবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
যে কারণে পেছাল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ
বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের সময় পিছিয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর, পরে চলতি বছরের ৩০ মার্চসহ আরও নানা তারিখের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া ৪ মে যুক্তরাষ্ট্র সময় বিকেল ৫টা (বাংলাদেশ সময় ৫মে ভোর চারটা) নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ২৫ এপ্রিল জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য তারিখ পেছানো হয়েছে। সবশেষ চলতি বছরের ৩০ মার্চ বঙ্গবন্ধু-১ স্লোরিডার লঞ্চিং প্যাডে পৌঁছেছে। পরবর্তী সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ মে। সময় পেছানোর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা আবহাওয়াকে দায়ী করছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও উৎক্ষেপণের বিষয়টি সম্পূর্ণ আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের তারিখ পেছানোর ঘটনা স্বাভাবিক।
বাকি অর্থ কীভাবে আসবে জানতে চাইলে বিসিএসবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ওই তথ্য ভুল রয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি।’
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর পেছনে ব্যয়কৃত অর্থ তুলে আনতে আমরা একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছি। এ অনুযায়ী আমরা ছয় বছরে বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলতে সক্ষম হব। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে আমাদের তত্ত্বাবধায়ন, কার্যক্রম, বাণিজ্যিক উন্নতি সাধন ও অন্যান্য কাজ পরিচালনার ওপর।’
এ ছাড়া দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ প্রকল্প বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিয়ে সরকারের আপাতত বাণিজ্যিক আয়ের চিন্তাভাবনা নেই বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে সেবা পাওয়া যাবে
> ডিজিটাল ডিভাইড দূর করতে সবচেয়ে অধিকতর কার্যকারী হবে স্যাটেলাইটি।
> বর্তমানে আমাদের দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অন্য দেশের স্যাটেলাইট থেকে কানেকটিভিটি কিনছে। চ্যানেলগুলো এই সেবা পাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে।
> দুর্গম অঞ্চলে সাশ্রয়ী কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বাধিক ভূমিকা রাখবে।
> ডিটিইএচ বা বিনোদনের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে।
সাত বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে ব্যয়কৃত অর্থ উঠিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনাকে তত্ত্বীয় ধারণা বলে মন্তব্য করেন তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান। তিনি বলেন, ‘সরকারের দুটি মাত্র কোম্পানি কেরু আর সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লাভজনক। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান লাভজনক না।
এখানে বলা হচ্ছে, আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পেছনে বিনিয়োগের প্রায় তিন হাজার কোটি উঠে আসবে। এটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু আমরা যদি ক্যাপাসিটি বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিক্রি করতে না পারি, তাহলে কোনো লাভ নেই।’
এই রকেটে করে মহাকাশে যাবে বঙ্গবন্ধু-১। ছবি: সংগৃহীত
আবু সাঈদ খানের মতে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ইন্স্যুরেন্স করা রয়েছে। যদি এটি উৎক্ষেপণের সময় বিস্ফোরিত হয়, তাহলে ইন্স্যুরেন্সের টাকা পাওয়া যাবে। তবে উৎক্ষেপণের পর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে স্যাটেলাইটের তরঙ্গ বিক্রি করতে না পারলে পুরো প্রকল্প বৃথা যাবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সফল করতে নগদ প্রণোদনা না দিয়ে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ওপর ট্যাক্স না বসিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান আবু সাঈদ খান।
১৫ বছরের জন্য গুণতে হয়েছে ২৫ মিলিয়ন ডলার
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই স্লটটি ২০১৩ সালে রাশিয়ান কোম্পানি স্পুটনিকের কাছ কেনে বিটিআরসি। ১৫ বছরের জন্য এই স্লট পেতে গুনতে হয়েছে ২৮ মিলিয়ন ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে দ্রাঘিমাংশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থাকবে এটি দেশের টেলিভিশনগুলোর জন্য হবে একটি চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নিজস্ব অরবিটাল স্লটে (৮৮-৯১ ডিগ্রি) এরই মধ্যে রাশিয়ার দুটি, জাপান ও মালয়েশিয়ার একটি করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। অরবিটাল স্লটের ৮৮-৮৯ ডিগ্রি এখনো খালি থাকলেও অরবিটাল স্লট বরাদ্দ দানকারী সংস্থা আইটিইউ ওই জায়গা বাংলাদেশকে বরাদ্দ দেয়নি। এ ছাড়া বারবার আইটিইউ’র কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থাকলেও বাংলাদেশ নিজস্ব অরবিটাল স্লট আনতে পারেনি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের লক্ষ্যে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি। চুক্তি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও নির্মাণে ঋণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পালন করছে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। এই স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় ইতোমধ্যে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। (প্রিয়.কম)
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/কেএস/৯:১৫এএম/২৭/৪/২০১৮ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি