জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, সুনামগঞ্জ : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য,জাতীয় সংসদের ৮ম বারের নির্বাচিত এমপি ও মুক্তিযুদ্ধে টেকেরঘাট সাবসেক্টরের অধিনায়ক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অন্তষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার ৬টা ৫০ মিনিটে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা সদরের আনোয়ারপুর নোয়াহাটি গ্রামস্থিত নিজের হাতে তৈরী করা বসতভিটের আঙ্গিনার উত্তরপার্শ্বে স্থাপিত চিতায় আনুষ্টানিকভাবে এই অন্তষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বর্ষীয়ান এই আওয়ামী লীগ নেতার চিতায় আগুন দিয়ে পিতার শেষ কৃত্যানুষ্টান শুরু করেন তাঁর একমাত্র পুত্র সৌমেন সেন গুপ্ত। এর আগে ৬টা ৩৫ মিনিটে তার নিতরদেহ নিজ বাড়ির শ্মশানখলা (চিতায়) তোলা হয়। জীবদ্ধশায় সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপির রোপন করা চন্দন কাঠ দিয়ে তার দাহ কার্যক্রম শুরু করা হয়। নিজ বাসভবনে নিজের রোপন করা রক্তচন্দন গাছের কাঠ ছাড়াও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় (দাহ) জ¹ডুমুর ও বেলগাছ ব্যবহার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ম্যানেজার সুজিত রায় ও পাশ্ববর্তী দিরাই কালী মন্দিরের পূজারী (সেবাইত)। তারা বলেন, প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজের হাতেই বাড়ির আঙ্গিনায় একটি রক্তচন্দন গাছ রোপন করেছিলেন। আজ সেই গাছেই তাকে দাহ করা হলো।
এসময় সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি জেলা বিএনপির আহবায়ক সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সুনামগঞ্জ ৫ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক, দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার,সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল কদ্দুছ,দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশাররফ মিয়া, উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আছাব উদ্দিন সরদার,সাবেক সভাপতি আলতাব উদ্দিন, দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার তৌহিদুজ্জামান পাভেল,ওসি আব্দুল জলিল,থানা আওয়ামীলীগ সেক্রেটারী প্রদীপ রায়, সহ-সভাপতি এডভোকেট ছইল মিয়া,প্যানেল মেয়র বিশ্বজিৎ রায় ও যুবলীগ নেতা রঞ্জন রায়সহ দিরাই থানার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে আগত হাজার হাজার আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী সমর্থক ও সুরঞ্জিত ভক্ত মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য ভাটির জনপদের কৃতিসন্তান বিশ্ববরেণ্য পার্লামেন্টেরিয়ান সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ডাক নাম দুখু সেন ১৯৩৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী সুনামগঞ্জের দিরাই থানার আনোয়ারপুর নয়াহাটি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ সেন গুপ্ত তৎকালীন থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর তৃতীয় শ্রেণির সরকারী কর্মচারী ছিলেন। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন স্থানীয় দিরাই আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি,সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি,সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ পাশ করেন। সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে আইন পাশ করে তিনি ১৯৭৩ সালে সুর্প্রীম কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭০ সালে কুড়েঘর প্রতীক নিয়ে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকার (দিরাই-শাল্লা) প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এমপিএ,১৯৭৯ সালে দোয়াত কলম প্রতীক নিয়ে একতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে,১৯৮৬ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এনএপি ও ৮ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রী দলের মনোনয়নে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে নিজ আসন থেকে ৫০৫ ভোটে পরাজিত হলেও পরবর্তীতে হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে উপনির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। এই সময় জাতীয় সংসদে ও সরকারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা পদে মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১,২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে নিজ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনে ১০ বার সংসদ নির্বাচনে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৮ বার তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত এমপি হিসেবে বিশ্বব্যপী সুনাম অর্জন করেন। ২বার তাকে পরাজিত করানো হয় নানা ষড়যন্ত্র ও কুট কৌশলের আশ্রয়ে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশে প্রগতির রাজনীতিতে দূর্দন্ড প্রতাপে বিচরনকারী সপ্তম জাতীয় নেতা। সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য পদে দায়িত্ব পালন ছাড়াও এই দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং আওয়ামীলীগের পার্লামেন্টারী মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যও ছিলেন আমৃত্যু। ১৯৭০ সালের নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তার কাছে বঙ্গবন্ধুর তারবার্তা পৌছলে তিনি স্থানীয়ভাবে দিরাই শাল্লা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে কিছুদিনের মধ্যেই চলে ভারতীয় সীমান্ত টেকেরঘাট ও বালাটে। সেখানে গড়ে তোলেন ৫নং সাবসেক্টর। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষে টেকেরঘাট সাবসেক্টর গঠন করে তিনি প্রথমে এই সাবসেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক হাজারেরও অধিক ছাত্র যুবককে শসস্ত্র ট্রেনিং দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণ করেন। দেশকে স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত করতে নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য লড়াই ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ট নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনী সভায় শাল্লা উপজেলার সভামঞ্চে,পরবর্তীতে দিরাই উপজেলা সদরে ও ঢাকায় আওয়ামীলীগের জনসভায় পর পর তিনবার গ্রেনেড বোমা হামলার শিকার হন তিনি। রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এক বছরের ব্যবধানে মন্ত্রীত্ব থেকে তাকেঁ সরে যেতে বাধ্য করা এবং তার উপর আনীত অপবাদকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন তার নির্বাচনী এলাকার জনগন। দেশ জাতি ও দলের জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ,ভালবাসা ও সক্রিয় অবদান রাখার পরও তাকে সরকার উপযুক্ত মূল্যায়ন করেনি বলে দাবী দিরাই শাল্লাবাসীর।
দিরাই-শাল্লার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের দাবী,সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত শুধু শুধু একটি নাম নয় একটি ইতিহাস,একটি জীবন্ত কিংবদন্তীর নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাধনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সততা সাম্য উদার মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাণপুরুষ। সম্প্রীতির রাজনীতির মডেল মানুষ হিসেবে বাংলার আপামর জনসাধারনকে অন্যায় অত্যাচার,বঞ্চনা বৈষম্য ও শোসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশ্ব রাজনীতিতে দখল করে নিয়েছেন মর্যাদার আসন। পার্লামেন্টারী রাজনীতির গুরু হিসেবে তার সফল অগ্রযাত্রা ছিলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতির রোনাল্ডো,জাতীয় রাজনীতির হেডমাস্টার,আঞ্চলিক রাজনীতির চান্সেলর,উন্নয়নের রাজনীতির উজ্জল নক্ষত্র,ইতিবাচক রাজনীতির কিংম্যাকার,অভিজ্ঞতার রাজনীতির সোহরাওয়ার্দী,বিদ্রোহের রাজনীতির ভাসানী,সাহসের রাজনীতির শেরেবাংলা,জনপ্রিয়তার রাজনীতির জাতীয় নেতা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির রাজা,ভাটি অঞ্চলের রাজনীতির সিংহপুরুষ এবং সর্বশেষ জাতির জনকের আদর্শে অণুপ্রাণিত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশপ্রেমিক খাটি বাঙ্গালী রাজনীতিবিদ। যোগ্যতার রাজনীতিতে তিনি সবসময়ই অপ্রতিদ্বন্দ্বি অনুসরনীয়,অজেয় ও অনুকরনীয় বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/আরএম/৮:৪৩এএম/৭/২/২০১৭ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি