ঢাকারনিউজ২৪.কম, ডেস্ক : গোহাটি শহরের নিতাই ঘোষ, দিলীপ ঘোষের সঙ্গে বরপেটার শেখ আজিমুদ্দিন বা বরাক উপত্যকার হাইলা কান্দির সাইফুল আলি— এদের আপাত কোনও মিল নেই। কিন্তু নাগরিক পঞ্জি তাদের এক তালিকায় এনে দিয়েছে। এরা কেউই নিজেদের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেননি।
তবে কী ভবিতব্য? এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে আসামের বুকে সেই তালিকায় নাম না ৪১ লাখ মানুষের মনে। তালিকায় নাম না থাকার অর্থ তারা নাগরিকত্ব হারাবেন। তারপর? সেই উত্তরটা স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ। আসামের শাসক দল বিজেপি হোক বা খোদ সরকার— কেউই এই প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছে না। আর সেখান থেকেই ক্রমাগত ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি। আর তার সঙ্গে গোটা রাজ্যজুড়ে উড়ে বেরাচ্ছে নানা গুজব।
আর তার মধ্যেই নাম না ওঠা মানুষরা অপেক্ষা করে আছেন ৭ আগস্টের জন্য। কারণ নাগরিক পঞ্জিকরণ সংস্থা জানিয়েছে, ওই দিন নাম যাদের তালিকায় নেই, তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে কেন তাদের নাম নেই।
প্রতীক হাজেলা, আসাম সরকারের মূখ্য সচিব এবং নাগরিক পঞ্জিকরণের দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি বুধবার রাতে আনন্দবাজারকে বলেন, ‘৭ আগস্ট থেকে এনআরসির বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে কেন নাম বাদ পড়ল।’
সেইসঙ্গে তিনি বলেন, ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন করে সময় দেওয়া হবে নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য ফের আবেদন করার। ওই সময়ের মধ্যে যাদের নাম উঠেছে তাদের নাম নিয়েও যদি কোনও অভিযোগ থাকে, তা হলে সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ যাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে তারাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন, যে চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম থাকবেই।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেই আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের বুধবারের ঘোষণা।
গোহাটি শহরের বুকে বাড়ি সুবিমল বিশ্বাসের। তিরিশ বছরের বেশি সময় তিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের কর্মী ছিলেন। তার নামও নেই এই তালিকায়। টেলিভিশনে তিনি খবর দেখতে গিয়ে জানতে পারেন, নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, যাদের নাম এই তালিকায় থাকবে না, তাদের নাম এখনই বাদ যাবে না ভোটার তালিকা থেকে। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকাতে নাম না থাকলে? পরবর্তীতে কী নাম থাকবে? সেটা জানেন না এরা কেউ।
আর্থিকভাবে যারা স্বচ্ছল, তাদের অনেকেরই যোগাযোগ রয়েছে কলকাতা বা শিলিগুড়িতে। বিপুল সরকার তাদেরই একজন। আদাবাড়ির এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘একান্তই যদি নাম না ওঠে, তা হলে বেঙ্গলে চলে যাব। শিলিগুড়িতে আমার ছোট শ্যালক থাকেন।’
বিপুলের যেটা ভাবা সম্ভব, তা আদৌ ভাবতে পারছেন না কামাখ্যা কলোনিতে পরিচারিকার কাজ করা গীতা দেবনাথ। তার ভাবনার স্রোত বরং বইছে অন্য খাতে। তিনি খুঁজছেন কোন মুরুব্বি ধরলে এই বার অন্তত নামটা উঠে যাবে।
এর মধ্যেই এনআরসিকে কেন্দ্র করে দিল্লির বুকে টানাপড়েন বা পড়শি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ— মানুষ নজর রাখছেন সব কিছুতেই। শহরের অনেকেই জানেন, বৃহস্পতিবার তৃণমূলের ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল প্রথমে শিলচরে যাবেন। তারপর গোহাটি আসবেন তারা।
যদিও তাতে তারা কতটা ভরসা পাচ্ছেন তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ শহরের অনেক পুরনো বাঙালি বলেন, ‘মমতা এখানে রাজনীতি না করলেই ভাল।’ তারা আশির দশকের আসাম আন্দেলনের উদাহরণ টেনেই বলেন, ‘আমরা যারা সংখ্যালঘু, তাদের সংখ্যাগুরুদের সাহায্য নিয়েই বাঁচতে হবে।’
এই চরম বিভ্রান্তির মাঝেই এনআরসি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, চূড়ান্ত তালিকাতে নাম না থাকলেও ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই যে তাদের ডিটেনসন ক্যাম্পে পাঠানো হবে।
এই ঘোষণা আদৌ স্বস্তি আনতে পারেনি মানুষের মনে। গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা হাফিজুল আলি। তার প্রশ্ন, ‘তাহলে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে একের পর এক ক্যাম্প তৈরি করছে কেন?’
এই অবিশ্বাসের আর অনিশ্চয়তার আবহের মধ্যেই আসামের কয়েক লাখ মানুষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করার।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/কেএস/১:০৫পিএম/২/৮/২০১৮ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি