সাব্বির আহমেদ : মানব মস্তিষ্ক বর্তমানে ডিপ্রেশনের কারখানা রূপে পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছে। কারণ কারখানা হতে যেমন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যোগান আসে ঠিক তেমনি আমাদের মস্তিষ্কও ডিপ্রেশনের যোগান দিতে একরকম পটু হয়ে উঠেছে। পারিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খায়িয়ে নতুন নতুন ডিপ্রেশনের মোড়ক উন্মোচন করতে মস্তিষ্ক এখন ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে।বর্তমান বাজারে যেসব জিনিসপত্র বিনামূল্যে পাওয়া যায় তার মধ্যে ডিপ্রেশন অন্যতম। আপনি নিতে না চাইলেও ঢের ডিপ্রেশনের অধিকারী হতে পারেন নিমেষেই।
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক ডিপ্রেশন বলতে আসলে কি বুঝায়৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে অবসন্ন মন(লো মুড), শক্তিহীনতা(লো এনার্জী) এবং উৎসাহহীনতা (লো ইন্টারেস্ট) কে ডিপ্রেশন বলা হয়েছে। ডিপ্রেশন' বলতে সম্ভবত মানসিক হতাশাকে বোঝায়। ব্যক্তি কিংবা পারিবারিক উভয় জীবনে মানুষ নানা রকম মানসিক হতাশায় ভোগে। প্রতিটি মানুষের জীবনেই এক সময় এ 'ডিপ্রেশন' নামক শব্দটা আসে। বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন বর্তমানে একটি প্রচলিত মানসিক সমস্যা। কারো মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতা চলতে থাকলে এটি পরবর্তীকালে জটিল মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO)-র মতে পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ মিলিয়নেরও বেশী মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে। বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনকে ২১ শতকের একটি গুরুতর অসুস্থতা চিহ্নিত করা হয়েছে। আধুনিক লাইফস্টাইলের নানা দিকের কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত জনসংখ্যা বেড়ে চলছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ ভুগছেন এই দুর্বিষহ মানসিক রোগে। WHO-র মতে,২০০৪ সালে বিষণ্নতা বিশ্বব্যাপী তৃতীয় প্রধান রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি প্রথম স্থানে স্থানান্তরিত হবে। ইতোমধ্যে ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যা প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ জন মানুষ ডিপ্রেশনের কারণে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। ঐ একই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিসংখ্যানটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে ৬ গুণ বেশি।
বাংলাদেশে ২০০৩-২০০৫ পর্যন্ত করা এক সমীক্ষায় দেখা যায় প্রায় প্রাপ্তবয়ষ্কদের মধ্যে প্রায় ১৬.১% মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। যার মধ্যে ৪.৬% হলো বিষণ্ণতার কারণে। অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশের প্রায় এক শতাংশ শিশু বিষণ্ণতায় ভুগছে,যার সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে সাধারণত এ রোগ বেশি হয় এবং পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিষণ্নতার হার বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে যেখানে বিষণ্ণতার হার ৩.৬%, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে তা ৫.১%।
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে কোনো একটি মাত্র কারণ দায়ী থাকে না; বরং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ জন্য জেনেটিক বা বংশগতির প্রভাব বা বায়োলজিক্যাল বা জীববিদ্যার প্রভাব এবং মনোদৈহিক প্রভাব ও জীবনব্যাপী বিভিন্ন মাত্রার মানসিক চাপের ফলে বিষণ্ণতা সৃষ্টি হতে পারে। মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক সমস্যার বহুমাত্রিক প্রভাবে বিষণ্ণতা হতে পারে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। আবার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রাসায়নিক অবকাঠামো নিউরোট্রান্সমিটারের নানাবিধ সমস্যার জন্য বিষণ্ণতা-সংক্রান্ত মানসিক অসুস্থতা সৃষ্টি হতে দেখা যায়। তবে এগুলো ছাড়াও নানাবিধ পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দুরবস্থা ব্যক্তির জীবনে ডিপ্রেশনের অবস্থা সৃষ্টি করে। যেসব ঘটনা ডিপ্রেশন বাড়িয়ে দেয় তার মধ্যে অন্যতম হলো অসুখী বিবাহ,কর্মস্থলের সমস্যা,বাসস্থানের সমস্যা, একাকীত্ব ইত্যাদি।
এখন আপনি কিভাবে বুঝবেন যে ডিপ্রেশন আপনাকে গ্রাস করেছে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা ডিপ্রেশনের কিছু লক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন। কিছু লক্ষণসমূহঃ মনে অশান্তি, কষ্ট, মন খালি খালি লাগা ও দুশ্চিন্তাবোধ,নেতিবাচক মনোভাব, সব কিছুতে হতাশা ও নিজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই ভাবা,উৎসাহহীনতা,আনন্দদায়ক কাজে আনন্দ না থাকা,নিজেকে সবসময় অপরাধী ভাবা,মৃত্যুর চিন্তাভাবনা, আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা,সবকাজে মনোযোগহীনতা এবং বিরক্তি ভাব,আত্মবিশ্বাসের অভাব,স্মরণ শক্তির সমস্যা,সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা,ঘুমের সমস্যা,খাওয়ায় অরুচি ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে উপরিউক্ত লক্ষণগুলো আপনার মাঝে দেখা দিলে আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন।
কারো মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ প্রকাশ পেলে কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করা জরুরি। অনেকভাবেই ডিপ্রেশন সারাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন গবেষকরা। ঔষধ, কাউন্সেলিং এর পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারকে অনেকেই ডিপ্রেশন চিকিৎসার নতুন উপায় হিসেবে দেখছেন।
ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সাইকোথেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষণ্নতার জন্য দুটি সবচেয়ে সাধারণ চিকিৎসা হলো এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধ এবং জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি। ডিপ্রেশন কাটানোর প্রথম কথা হলো আপনার এই অনুভূতির কথা বিশ্বস্ত কারো কাছে বলুন। এতে করে মন অনেকটাই হালকা হয় এবং ডিপ্রেশনের লেভেল কমে যায়।
পৃথিবীর খুব কম মানুষই তার দুঃসময়ে পাশে থাকার মতো কাউকে পায়। সবাই আনন্দে ডুবে থাকতে ব্যস্ত। নিজেকে ভালো রাখতে হাজার উপায়ে আপনার সাহায্য নেবে। কিন্তু দিনশেষে যখন আপনি হতাশায় ভোগেন, এক উপায়ে সাহায্য করার মতো কাউকে আর আপনি খুঁজে পাবেন না। তাই আপনার পারিপার্শ্বিকতার দুরবস্থার কারণে নিজেকে ডিপ্রেশনের কারখানা বানাবেন না। দেশ এবং জাতির ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আমাদের সকলের সচেতন হওয়া উচিত ।
লেখকঃ সাব্বির আহমেদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/কেএস/১২:৩২পিএম/২১/৪/২০১৯ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি