কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক অনুপস্থিত থেকেও সরকারি সুযোগ সুবিধার ভোগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসকল শিক্ষকরা অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে অবগত হলেও নিরব ভূমিকায় প্রশাসনসহ শিক্ষা বিভাগ।
সরেজমিনে দেখাযায়, ৩০জানুয়ারি জেলার নাগেশ^রী উপজেলার কেদার ইউনিয়নের ঢলুয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫জন শিক্ষকের পরিবর্তে উপস্থিত ৩জন শিক্ষক। প্রায় ২৫০জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন তারাই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকলেও অপর সহকারি শিক্ষক সানজিদা শারমিন ২০১৬সালের ২ এপ্রিল যোগদান করার পর থেকে আর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার স্বামী পেশায় কাষ্টমস ইন্সপেক্টর আর শশুড় উপজেলা শিক্ষক নেতা হাফিজুর রহমান বাবু। একই উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের টেপারকুটি মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫জন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত মাত্র ২জন সহকারি শিক্ষক। এই ২জনই ১৫০জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন। উপস্থিত নেই প্রধান শিক্ষকও। এখানে সহকারি শিক্ষক শিরিন আক্তার ২০১৫সালে যোগদানের পর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। তার বাবা আব্বাস আলী একজন অবসর প্রাপ্ত সাব রেজিস্টার। তার বাড়ি ভূরুঙ্গামারী শহরেই। ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথরডুবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খন্দকার শামীমা সুলতানা স্বর্ণালী ২০১৬সালের ১জানুয়ারি যোগদান করেন। তিনি একই বছরের ২৩সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। অভিযোগ রয়েছে তিনি এখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসুরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখাযায় প্রায় ২৫০জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন একজন ভাড়াটিয়া শিক্ষকসহ ২জন সহকারি শিক্ষক। এই বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক শিউলি বেগম তিনিও অনিয়মিত। তিনি মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেন। আর তার স্বাক্ষরিত তারিখ বিহীন ছুটির দরখাস্ত তৈরি থাকে। কেউ বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গেলেই দরখাস্তে তারিখ বসিয়ে ছুটি দেখানো হয়। ঘটনার সত্যতা মেলে ২৯জানুয়ারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাজিরা খাতায় প্রধান শিক্ষক গোলাপ উদ্দিন এবং সহকারি শিক্ষক শিউলি বেগমের স্বাক্ষর নেই। শিউলি বেগমের স্বামী ঢাকায় কর্মরত একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। তিনি নিয়মিত বিদ্যালয় না এসে ঢাকায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঐদিন পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ১১টার সময় গিয়ে দেখাযায়, এই বিদ্যালয়ে ৮জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র একজন শিক্ষক উপস্থিত হয়েছেন। অথচ বিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষকরা নিয়মিত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব শিক্ষক এবং তাদের স্বজনরা প্রভাবশালী হওয়ায় অন্য সহকারি শিক্ষকরা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। ফলে প্রভাব বিস্তার করেই শিক্ষা বিভাগ এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় বসেই অনিয়মতি থেকেও সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। এতে করে শিক্ষকদের এমন অনিয়মের কারনে জেলার প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাসুরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক কনা বলেন,শিউলি আপা ব্যাপারে প্রধান শিক্ষকই ভাল বলতে পারবেন। এই বিদ্যালয়ের ভাড়াটিয়া শিক্ষক একরামুল হক স্বীকার করেন, তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট থাকায় বেতন ছাড়াই এক প্রকার স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদানে সহযোগিতা করছেন।
ফোনে সহাকারি শিক্ষক শিউলি বেগম ফোনে জানান, প্রধান শিক্ষককে বলেই তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসছেন। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করে তিনি উপজেলায় কি করছেন এমন প্রশ্নে ফোন কেটে দেন।
ঢলুয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ও ফেরদৌসী জানান,সানজিদা শারমিন দীর্ঘদিন থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন। কিন্তু বেতনভাতাদি তুলছেন কিনা আমরা জানিনা।
টেপারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক জহুরুল ও লাইলী বলেন, শিরিন আপা বহুদিন থেকে বিদ্যালয়ে আসে না। বিষয়টি প্রধান শিক্ষক কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এ্যাড. আহসান হাবীব নীলু বলেন, সরকারের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলের বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কঠোরভাবে দমনে আইনের শাসন সবার জন্য সমান ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। জেলা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার উপর তাগিদ দেন।
নাগেশ^রী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোসলেম উদ্দিন শাহ্ জানান, বিষয়টি আমি জানার পর প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে এ্যাকশন নেবার জন্য আমার উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষকে কপি দিয়েছি। আমি এই পর্যন্ত বলতে পারি।
জেলা শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন,এই বিষয়ে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাযায়, জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১২৩৭টির মধ্যে চরাঞ্চলে মধ্যে ২০৬টি বিদ্যালয়। জেলায় প্রধান শিক্ষকের ১২১৯টি পদের মধ্যে কর্মরত আছে ১০৭২জন। সহকারি শিক্ষক ৬১১৩টি অনুমোদিত পদে সহকারি শিক্ষক কর্মরত আছে ৫৮১৭জন। গত এক বছরে অনুপস্থিতিসহ অন্যান্য অভিযোগের ভিত্তিতে জেলায় বিভাগী মামলা হয়েছে প্রায় ২০টি। এরমধ্যে তিরস্কার, ইনক্রিমেন্ট কর্তনসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় ৫জনের বিরুদ্ধে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাফিজুর রহমান, মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার কঠোর অবস্থানে। কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড়া দেবার সুযোগ নেই। শিক্ষক অনুপস্থিতির তথ্য এবং তালিকা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দেন তিনি।
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১১:৩০পিএম/২/২/২০১৯ইং)
প্রধান সম্পাদক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি