

ঢাকারনিউজ২৪.কম, ঢাকা : বৃহস্পতিবার আষাঢ়ের প্রথম দিন। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মের দাবদাহ ও ভ্যাপসা গরম প্রশমনের প্রাণষ্পর্শী বর্ষাঋতুর প্রথম দিন।
আবহমান কাল ধরে বাঙালির জীবন, পরিবেশ, কৃষ্টি, সামাজিকতা, আনন্দ-বেদনা, চলন-বলন, গান, উৎসব, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ঘিরে বর্ষা আলোকবর্তিকা হিসেবেই সমাদৃত। সার্বিক বোধন আর আরাধনায় আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষকাল বাঙালিকে আবিষ্ট করে রেখেছে।
এজন্যই বর্ষার আগমনের সূচনালগ্নে আষাঢ়ের প্রথম দিনটিকে বরণ করে নিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আদিকাল থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় বর্ষাঋতু নিয়ে রয়েছে উচ্ছ্বসিত বন্দনা, অনুরাগ ও স্তুতি। রহস্যময়ী এ বর্ষার রূপ, বৈচিত্র্য, চমক, বর্ণচ্ছটা এবং আকাশ- প্রকৃতির গভীর মিতালী শিল্প-সাহিত্যের সরস উপকরণ হিসেবে আবহমানকাল থেকেই অনুপ্রাণিত ও স্পন্দিত করছে শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য সাহিত্যসহ সব ধরনের সাহিত্যকর্মে বর্ষা স্থান পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশ্বকবির কাছে প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। তাই তার বিভিন্ন গানে প্রজ্জ্বোল হয়ে উঠে এসেছে মেঘ-মেদুর বর্ষার রূপ ঐশ্বর্যের শিল্পিত বর্ণনা। তিনি লিখেছেন- ‘বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা, আষাঢ় তোমার মালা/ তোমার শ্যামল শোভা বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা ॥/ তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে, ফসল ফলে/ মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফলের ডালা ॥…’ অথবা ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,/ আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,/ কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্ চাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে…’/ অথবা ’বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল।’
তবে কবির এমনই আহবানের মতো দেশবাসীরও আশা, বর্ষার আগমনে তাপিত গ্রীষ্মের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হবে। দাবদাহে হাঁসফাঁস হয়ে ওঠা মানুষগুলো স্বস্তি পাবে। জলভরা মেঘের আষাঢ় এসে যবনিকা টেনে দেবে বহমান দীর্ঘ তাপদহনের জ্বালা- যন্ত্রণার অধ্যায়ের, অর্থাৎ গ্রীষ্মের।
বর্ষার আগমনে দাবদাহে কাহিল মানবকুলের সঙ্গে মুক্তি পাবে প্রকৃতি এবং উদ্ভিদরাজিও। শান্তি, স্বস্তি ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেতে তাই মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ের মধ্যেই চলছে একে বরণ করে নেয়ার নানা আয়োজন।
আজ আষাঢ়স্যের প্রথম দিবসে বৃষ্টি হবে কি হবে না, তা বলা যায় না।তবে আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে। ইদানীং বদলে গেছে বাংলার আবহাওয়া ও জলবায়ুর গতি- প্রকৃতি। বৃষ্টি ধাবাহিকতা রক্ষা করেনি, হয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু দাবদাহে নাভিশ্বাস উঠেছে মানব ও প্রাণীকুলের।
অসহনীয় তাপে, লু হাওয়ার দাপটে বাংলাদেশ ধুঁকেছে এবারো প্রচণ্ড। ইতিমধ্যে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় ৪১ ডিগ্রি (রাজশাহীতে) সেলসিয়াস তাপমাত্রা। দাবদাহের কারণে রোগ- বালাইসহ নানা ধরনের দুঃসহ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। বর্ষার আগমনে দুর্ভোগের সেই পালা ফুরিয়ে আসবে, এ আশায় মানুষ আনন্দে উদ্বেল ও উৎফুল্ল।
চিরকালই বর্ষাঋতু’র আবাহন এই দেশের প্রকৃতিকে বদলে দেয় নানারূপে, নানা চিত্রধারায়। নদ-নদীতে বাড়তে থাকে জলের ধারা। খাল-বিলে ফিরে আসে চিরচেনা রূপের বহর। মৌসুমী বায়ুর বহতায় প্রকৃতির অন্তর জুড়িয়ে দেয় শীতল বাতাস আর বৃষ্টিমাখা বায়ুস্তর। প্রাণান্ত শান্তির পরশ ফিরে আসে সামাজিক জীবনে।
এছাড়া কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ, কদমফুলের চোখ জুড়ানো শোভা ও পেখম খোলা ময়ূরের উচ্ছ্বল নৃত্যের আবাহন থাকে এই আষাঢ়েই। তাই প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ আষাঢ়কে বলেছেন- ‘ধ্যানমগ্ন বাউল- সুখের বাঁশি’।
তবে বর্ষা নিয়ে নবযৌবন আর যৌবনের কবিদের আদিখ্যেতা থাকলেও একে নিয়ে অনুযোগেরও কমতি নেই। কাব্যলক্ষ্মীর সাধনায় যাদের আগ্রহ কম, তাদের অনেকের কাছেই বর্ষা ভোগান্তিরও বটে। কেননা আষাঢ় মানেই বৃষ্টির ঘনঘটা। বৃষ্টির তোড়ে যাওয়া যায় না ঘরের বাইরে। বিশেষ করে নগরের রাস্তায় বের হওয়া মানেই চরম দুর্ভোগ কমে যায় দিন-মজুরের আয়-উপার্জন। গ্রামাঞ্চলেও অনেক সময়ে কাজের ব্যাঘাত ঘটে। বর্ষার ঢল অনেক সময়ে বন্যারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তারপরও বর্ষা নিয়ে যে যাই বলুক বা ঘটুক, বর্ষা যে বাঙালির মনন জুড়ে এক ভিন্নমাত্রা যোগকারী ঋতু সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বর্ষার আগমনকে স্বাগত জানাতে সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে শনিবার সকালে এবং টিএসসি সংলগ্ন ডাসের পেছনে সোপার্জিত স্বাধীনতা মঞ্চে আষাঢ়স্য প্রথম দিবস তথা বর্ষা উৎসব উদযাপন করবে।
শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় শিল্পী অলক সেনের মেঘমল্লার রাগ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ষা অনুষ্ঠানের সূচনা করা হবে। এ পর্বের উদ্বোধন করবেন প্রফেসর অ্যামিরিটাস ড. আনিসুজ্জামান।
সন্ধ্যায় সোপার্জিত স্বাধীনতা মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা।
এছাড়াও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যদিয়ে আষাঢ়ের প্রথম দিনে উদযাপন করবে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রেও দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানমালার মধ্যদিয়ে বর্ষা উৎসব উদযাপন করা হবে।
এছাড়া বর্ষাকে ঘিরে আগারগাঁওয়ের বাণিজ্য মেলা মাঠে এখন চলছে বৃক্ষমেলা। মেলার পাশাপাশি চলছে সরকারের নেয়া তিন মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও। (নতুনবাংলা)
(ঢাকারনিউজ২৪.কম/এসডিপি/১০:১৮এএম/১৫/৬/২০১৭ইং)
আপনার মতামত লিখুন :